ট্রাম্পের বিজয়ের পর আমেরিকায় 'হেট ক্রাইম' কি বাড়ছে?

Republican rally
ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনের সময় মুসলমান বিরোধী প্রচারণা
Published

আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে "হেট ক্রাইমের" অভিযোগের বেশ কিছু খবর পোস্ট করা হয়েছে।

"আমি আমার কলেজ লাইব্রেরিতে বসেছিলাম। ট্রাম্পের ছবিওয়ালা শার্ট পরা লম্বা চওড়া এক ব্যক্তি হঠাৎ আমার পেছনে এসে দাঁড়াল। আমি মুখ ঘোরাতে গেছি, কিন্তু তার আগেই দেখলাম একটা হাত আমার হিজাব টেনে খুলে ফেলার চেষ্টা করছে।"

নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রী বিবিসি ট্রেন্ডিং-কে বলেছেন তিনি কোনোমতে ওই হামলাকারীর কবল থেকে পালাতে সক্ষম হয়েছেন।

ওই ছাত্রী বলেন, "আমি ঐ ব্যক্তিকে বললাম আপনি যেমনটা চান তেমনটা বিশ্বাস করার অধিকার আপনার আছে। আমাকেও আপনি যা বলতে চান বলতে পারেন। কিন্তু আমার গায়ে হাত দেবার কোনো অধিকার আপনার নেই। লোকটি তখন সরে গেল, কিন্তু বলল তুমি আমার দিকে গ্রেনেড ছুঁড়বে নাকি?"

মঙ্গলবারের নির্বাচনের পর থেকে এধরনের বেশ কিছু অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট ও শেয়ার করা হয়েছে বলে বিবিসি ট্রেন্ডিং খবর দিচ্ছে।

এধরনের সব অভিযোগের ক্ষেত্রেই বলা হচ্ছে এসব ঘটনার পেছনে কাজ করছে ধর্ম ও বর্ণ বিদ্বেষ। কিন্তু বিবিসি বলছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব অভিযোগের সত্যতা বা মঙ্গলবারের নির্বাচনের সঙ্গে এর আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কীনা তা যাচাই করা অসম্ভব।

Twitter posting
ছবির ক্যাপশান, নিউ ইয়র্ক স্টেটের ওয়েলসভিলের ছোট এক গ্রামে খেলার মাঠের দেওয়ালে স্বস্তিকা চিহ্নের পাশে লেখা হয়েছে "আমেরিকা আবার শ্বেতাঙ্গদের হোক্''- টুইটার বার্তা

নিউ মেক্সিকোর ঘটনায় ঐ ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ঐ ঘটনার কথা জানিয়েছে, কিন্তু পুলিশে কোনো খবর দেয় নি।

"আমি কারো বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করতে চাই না, কারণ কারো মুখোশ খোলাটা আমার কাজ নয়," বলছেন ঐ ছাত্রী। "লোকটি ভুল করেছে এবং এই ঘটনা যেভাবে প্রচার পেয়েছে তারপর আশা করি সে শোধরাবে।"

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে ক্যাম্পাসে সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনার বিষয়ে তারা তদন্ত করছে, তবে আইনী বিধির কারণে এসব ঘটনা নিয়ে তারা খোলাখুলি মন্তব্য করতে অপারগ।

"হেট ক্রাইম" বা বিদ্বেষমূলক যেসব অপরাধের খবর সামাজিক মাধ্যমে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে:

  • ফিলাডেলফিয়াতে বিভিন্ন ভবনের দেওয়ালে ট্রাম্প সমর্থক নানা দেওয়াল লিখনের সঙ্গে নাৎসীদের বেশ কয়েকটি প্রতীকী স্বস্তিকা চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়েছে। একটি ঘটনায় গাড়ির গায়ে বর্ণবাদী মন্তব্যের পাশে লেখা হয়েছে "ট্রাম্পের শাসন"।
  • নিউ ইয়র্ক স্টেটের ওয়েলসভিলের ছোট এক গ্রামে খেলার মাঠের দেওয়ালে স্বস্তিকা চিহ্নের পাশে লেখা হয়েছে "আমেরিকা আবার শ্বেতাঙ্গদের হোক্।"
  • ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ডিয়েগোতে এক নারীর ব্যাগ ও গাড়ি ছিনিয়ে নেওয়া দুজন লোক ডাকাতির সময় "ট্রাম্প ও মুসলমান" সংক্রান্ত মন্তব্য করে বলে পুলিশ জানিয়েছে। পুলিশ বলছে তারা এই ঘটনাকে "হেট ক্রাইম" হিসাবে দেখছে এবং এ বিষয়ে তদন্ত করছে।

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরাও আক্রান্ত হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।

  • ক্যালিফোর্নিয়ায় এক তরুণী ইনস্টাগ্রামে ট্রাম্পকে সমর্থন করে মন্তব্য করায় পরদিন কলেজে তার উপর হামলা চালানো হয়েছে। তার বাবা মা বলেছেন ঐ হামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
  • শিকাগোতে ট্রাফিক দুর্ঘটনার শিকার এক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিকে মারধোর করে তার জিনিসপত্র লুটপাট করেছে একদল কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। ঐ হামলার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে যাতে সেখানে জড়ো হওয়া লোকজনকে বলতে শোনা যাচ্ছে "ডোন্ট ভোট ট্রাম্প"।
Tweet
ছবির ক্যাপশান, টুইটারে আরও কিছু পোস্টিং

বানানো গল্পও শোনা যাচ্ছে এই হুজুগে। লুইসিয়ানায় এক ছাত্র বর্ণবাদী হামলার শিকার হয়েছে এমন খবর ছড়িয়ে বলে দুই যুবক তাকে উদ্দেশ্য করে বর্ণবিদ্বেষী গালিগালাজ করেছে। পরে জানা যায় গোটা ঘটনাই সাজানো।

এমনকী সংখ্যালঘুদের উপর পুরনো হামলা ও হেট ক্রাইমের অনেক খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে- যেগুলো নির্বাচনের অনেক আগের ঘটনা- নির্বাচনের সঙ্গে সেগুলোর কোনো যোগাযোগ নেই।

বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা নানা ঘটনা, নানা মন্তব্য হাজার হাজার বার শেয়ার হচ্ছে।

Twitter posting
ছবির ক্যাপশান, টুইটারে পোস্টিং

ব্রিটেনে জুন মাসে ব্রেক্সিট গণভোটের পরপরই ধর্ম ও বর্ণ বিদ্বেষের ঘটনা এক লাফে ৪১ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। অগাস্টে এধরনের ঘটনার খবর কমলেও তার মাত্রা ব্রিটেনে আগের রেকর্ডের তুলনায় বেশি বলেই বলা হচ্ছে । তবে একথাও বলা হচ্ছে যে ব্রেক্সিট ভোটের পর এধরনের ঘটনা পুলিশে নথিভুক্ত করার রেওয়াজ বেড়ে যাওয়ায় তা চোখে পড়ছে বেশি এবং পরিসংখ্যানেও তার প্রতিফলন ঘটছে।

আমেরিকাতেও বর্ণবৈষম্য নজিরবিহীন কোনো ঘটনা নয়। তবে মিঃ ট্রাম্পের জয়লাভ এধরনের "হেট ক্রাইম" আসলেই বাড়িয়ে দিয়েছে কীনা তা বুঝতে আরও সময় লাগবে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।