জয়াললিতার শেষকৃত্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল

ছবির উৎস, MANJUNATH KIRAN
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
- Published
ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনীতিবিদ ও তামিলনাডুর প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়াললিতাকে আজ চেন্নাইতে লক্ষ লক্ষ শোকার্ত মানুষ চোখের জলে শেষ বিদায় জানিয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
এর আগে শহরের রাজাজি হলে তার মরদেহ যখন শায়িত ছিল - তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মতো ভিভিআইপি থেকে শুরু করে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ জয়াললিতাকে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেছিলেন, অগুনতি মানুষ ভেঙে পড়েছিলেন কান্নায়।
হাজারো বিতর্ক, আদালতে জেলের সাজা সব কিছুর পরেও একজন রাজনীতিক যে তুমুল জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেন - জয়াললিতা ছিলেন তার এক বিরল দৃষ্টান্ত।
কিন্তু কীভাবে তিনি সেটা সম্ভব করেছিলেন?

ছবির উৎস, MANJUNATH KIRAN
ভারতের তামিলনাডু যাকে আম্মা নামে চেনে, সেই জয়াললিতার অন্তিম যাত্রায় আজ অচল হয়ে গিয়েছিল গোটা চেন্নাই শহর, পুরাচ্চি থালাইভি বা বিপ্লবী নেত্রীর বিদায়ে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল শোক আর আবেগ।
রাজাজি হল থেকে মেরিনা বিচ পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ অন্তিম যাত্রায় যখন জয়াললিতাকে চন্দন কাঠের শবাধারে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ চোখের জল মুছতে মুছতে তাতে সামিল হয়েছিলেন।
কিন্তু একজন রাজনীতিবিদের জন্য কেন এই ভালবাসা ও আবেগের বিস্ফোরণ?
বিবিসি তামিল বিভাগের সম্পাদক থিরুমালাই মানিভান্নানের মতে, এর প্রধান কারণ দল হিসেবে এঅঅইডিএমকে-র সাংগঠনিক শক্তি।
তিনি বলছেন, "এআইডিএমকে এবং যে দ্রাবিড় দল ভেঙে তার সৃষ্টি, সেই ডিএমকে - উভয়েরই সাংগঠনিক শক্তি দারুণ। এই দলে নেতাদের রাজনৈতিক উত্থান-পতন বা আদালতে সাজা হলেও দলের ক্যাডার বা সমর্থকদের আনুগত্যে কোনও ফাটল ধরে না। জয়াললিতা তার রাজনৈতিক গুরু এমজিআরের কাছ থেকে এরকম সুসংগঠিত একটা দলের রাশ হাতে পেয়েছিলেন, সেটা না-পেলে তিনি তামিল রাজনীতিতে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন কি না সন্দেহ আছে।"

ছবির উৎস, MANJUNATH KIRAN
অনেকটা একই সুরে দেশের বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক আশিস নন্দী বলছিলেন, জয়াললিতা প্রথাগত রাজনীতির সবগুলো ধাপ পেরিয়ে আসেননি - কিন্তু মিডিয়ার চতুর ব্যবহার তাকে ঠিকই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল।
কিন্তু দুর্নীতির অজস্র অভিযোগ, বিপুল সম্পত্তি বানানো বা এমন কী জেলের সাজাও কি তাতে কোনও চিড় ধরাতে পারে না?
আশিস নন্দী বলছেন, "না, পারে না। কারণ তাদের কাছে এগুলো সব মিথ্যে, সাজানো, ভুয়ো - কিংবা নেত্রীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। আবার প্রতিপক্ষ ডিএমকে-র লোকদের জিজ্ঞেস করুন, তারা আবার এগুলো সত্যি বলে মনে করে। ডিএমকে নেতা করুণানিধির স্তাবকরা মনে করেন তাদের নেতা কোনও দুর্নীতি করতেই পারেন না, সব দুর্নীতির মূল হলেন জয়াললিতা!"
"তাই মনে রাখতে হবে জয়াললিতা কিন্তু গোটা তামিলনাডুর আম্মা নন - তিনি অর্ধেক রাজ্যের আম্মা, আর বাকি অর্ধেকের কাছে সৎমা। তবে বিরোধী ডিএমকে এখন চুপচাপ আছে, কারণ ভদ্রমহিলা সবে মারা গেছেন - এখন অন্য কিছু বললে জনতা সেটা ভালভাবে নেবে না", মনে করছেন আশিস নন্দী।
আশিস নন্দী যেমনটা বলছেন, অর্ধেক তামিলনাডুর কাছে তিনি হয়তো আম্মা নন - সৎমা, তার পরেও একটা বিপুল সংখ্যক মানুষ, বিশেষত মহিলাদের কাছে তার জনপ্রিয়তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।
মি মানিভান্নান বলছিলেন, এর পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার বেশ কিছু পদক্ষেপের ভূমিকা আছে।
তিনি বলছেন, "একজন নির্বাচিত মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিরিশ বছরের লম্বা ইনিংসে তিনি মহিলাদের জন্য অনেক প্রকল্প নিয়েছিলেন। সারা দেশে প্রথম মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত পুলিশ-থানাই হোক বা কন্যাভ্রূণ হত্যা রোধে তার দোলনা প্রকল্প, মহিলাদেরকে তার কাছাকাছি এনে দিয়েছিল।"
"আম্মাস ক্যান্টিনে শস্তায় খেতে পাওয়া, একটা দারুণ স্বাস্থ্য পরিষেবা কাঠামো বা বিনি পয়সায় আরও নানা সুযোগ সুবিধা সেই ইমোশনাল কানেক্টটাকেই আরও শক্তিশালী করেছিল", বলছিলেন বিবিসি তামিল বিভাগের প্রধান।
তিনি আরও বলছেন, সমাজের দুর্বল, অনগ্রসর বা প্রোলেতারিয়েত শ্রেণীতে এআইডিএমকে-র জনভিত্তি বরাবরই শক্তিশালী।
তার সঙ্গে নেতা বা নেত্রীর প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য বা আবেগ দেখানোর জন্যও তামিলরা পরিচিত - আর এই সবগুলো ফ্যাক্টর মিলেই জয়াললিতার প্রয়াণ তামিলনাডুকে আজ এতখানি শোকার্ত করে তুলেছে।








