২০০০ সালে বিল ক্লিনটন ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনীদের বিরোধ মেটানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন
ফিলিস্তিনী এবং ইসরায়েলীদের মধ্যে অব্যাহত রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের একটি শান্তিপূর্ণ ইতি ঘটাতে উন্মুখ ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ২০০০ সালের গ্রীষ্মে মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে প্রেসিডেন্টের অবকাশ কেন্দ্র ক্যাম্প ডেভিডে মি ক্লিনটন বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি এক বৈঠকের আয়োজন করেন।
শুরুর দিনে ক্যাম্প ডেভিডের দোরগোড়ায় প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসের আরাফাত এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাককে পাশে নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিন জনই ছিলেন হাস্যোজ্জল।
ইসরায়েল এই শীর্ষ বৈঠকের জন্য আগ্রহী ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান আরাফাত সন্দিহান ছিলেন। তার কথা ছিল - আগের বিভিন্ন বৈঠকে যেখানে বলার মত কোনো অগ্রগতিই হয়নি, সেখানে এ ধরণের শীর্ষ বৈঠক করে আদৌ কোনো লাভ হবে কিনা।
মিশরীয় বংশোদ্ভূত গামাল হেলাল তখন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং হোয়াইট হাউজে একজন দোভাষী হিসাবে কাজ করতেন। মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে তিনি উপদেষ্টার ভূমিকাও পালন করতেন। বিশেষ করে বছরের পর বছর ধরে তিনি ফিলিস্তিনী এবং ইসরায়েলি ইস্যুতে যুক্ত ছিলেন। ক্যাম্প ডেভিডের সেই বৈঠকেও তিনি আমেরিকানদের পক্ষে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন। বিবিসির কাছে স্মৃতিচারণে মি হেলাল বলেন, বিল ক্লিনটন এই বৈঠকে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন, এবং তিনি ইতিবাচক একটি ফলাফল নিয়ে আশাবাদী ছিলেন।
"প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন মনে করতেন, এখন যদি না হয়, তাহলে আর কখন হবে। তার হাতে সময় ছিল ৬ মাস। তিনি বিশ্বাস করতেন, এ ধরণের একটি শীর্ষ বৈঠক যদি না করা হয়, তাহলে বোঝাই যাবেনা যে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনীদের মধ্যে একটি মীমাংসা আদৌ সম্ভব কিনা।"

ছবির উৎস, AFP
১৯৯৩ সালে হোয়াইট হাউজের চত্বরে ইয়াসের আরাফাত এবং তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইতজাক রাবিনের মধ্যে করমর্দনের সাক্ষী ছিলেন বিল ক্লিনটন। অসলো শান্তি চুক্তির আওতায় অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং গাজা থেকে ইসরায়েল পর্যায়ক্রমে সৈন্য সরিয়ে নিতে রাজী হয়। চুক্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন একটি ফিলিস্তিনী সরকার গঠনেও রাজী হয় তারা। কিন্তু চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে দুই পক্ষের মধ্যে অগ্রগতি ছিল খুবই কম, এবং স্পর্শকাতর গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে কোনো সুরাহা হয়নি।
বিল ক্লিনটন চেয়েছিলেন ক্যাম্প ডেভিড শীর্ষ বৈঠকে সীমান্ত, জেরুজালেম এবং ফিলিস্তিনী শরণার্থীদের অধিকারের মত স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে ঐক্যমত্য তৈরি হোক যাতে দুই পক্ষ চূড়ান্ত একটি পৌছুতে পারে।
"ক্যাম্প ডেভিড এমন একটি স্থান যার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল । যেমন - সেলফোনের ব্যবহার, বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ - এসবের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। আমরা দিনরাত কাজ করছিলাম। ভোর চারটা, সাড়ে চারটার দিকে ঘুমাতে যেতাম। আবার সকাল ছটা সাড়ে ছটার মধ্যে উঠে পড়তাম।"
ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনীরা রাতদিন নিজেদের মধ্যে কথা বলতো। পাশাপাশি তারা আলাদাভাবে আমেরিকানদের সাথে বসতো। কিন্তু এহুদ বারাক এবং ইয়াসের আরাফাতের মধ্যে মুখোমুখি দেখা খুব কমই হতো। মি গামাল বলেন, দুই পক্ষের অবিশ্বাস ছিল তীব্র
"একমাত্র রাতের খাবারের সময় তিনপক্ষ এক জায়গায় হতো। প্রধান টেবিলে বসতেন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন, প্রধানমন্ত্রী বারাক, চেয়ারম্যান আরাফাত, আমি এবং তিনপক্ষের মীমাংসাকারী দলের বেশ কজন। সেখানেই তাদের মধ্যে মেলামেশা হতো। কিন্তু যেটা হতো না তা হলো, তিনপক্ষের শীর্ষ স্তরের মধ্যে একসাথে বসে কোনো কথা হতো না। কারণ, প্রধানমন্ত্রী বারাক তা চাননি।"
সুতরাং কথাবার্তার বেলায় পরিবেশ ভালো হলেও, মীমাংসা আলোচনায় তার প্রতিফলন হতো না । কিন্তু এই শীর্ষ বৈঠকের উদ্দেশ্যই ছিল মীমাংসা। কিন্তু কোনো ছাড়া না দেওয়ার ব্যাপারে দু পক্ষের মীমাংসাকারীদের ওপর তাদের নিজের নিজের শিবির থেকে চাপ ছিলো। ঐ বৈঠকে মি আরাফাত এবং মি বারাক জেরুজালেমের ওপর অধিকারের ইস্যুতে কোনো ছাড় দিতে রাজী হচিছলেন না।

ছবির উৎস, Getty Images
ফলে এক সপ্তাহ পরও ক্যাম্প ডেভিডের বৈঠকে কোনো অগ্রগতি হচিছল না। গামাল হেলালকে পাঠানো হল ফিলিস্তিনী নেতার কাছে।
"আমি খুব পরিষ্কার ভাষায় তাকে একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করলাম - দেখুন দশকের পর দশক ফিলিস্তিনীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিলনা, তাদের সিদ্ধান্ত নিতো অন্য কোনো দেশ। এই প্রথম ফিলিস্তিনীদের সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনীদের হাতে। এবং আমি ভয় পাচ্ছি আপনি যদি সব ব্যাপারেই না বলতে থাকেন, তাহলে এই সুযোগ আর হয়তো কখনই আসবে না। আরো নতুন নতুন ইহুদি বসতি উঠবে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করার জন্য আপনাদের হয়তো কোনো জায়গাই থাকবে না। দয়া করে এই সুযোগ ছাড়বেন না। তিনি খুব ঠাণ্ডাভাবে আমার কথাগুলো শুনলেন। এক দেড় ঘণ্টা ধরে একটি কথাও বললেন না।"
"আমি কথা শেষ করলে, তিনি শুধু বললেন - আমি পারবো না। অমি বললাম কেন নয়। তিনি বললেন, আমি যদি এই সব শর্তে রাজী হয়, তারা আমাকে মেরে ফেলবে। আমি প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের কাছে ফিরে গিয়ে বললাম, মি আরাফাত পারবেন না। প্রেসিডেন্ট বললেন, তিনি পারবেন।"
প্রধানমন্ত্রী বারাকের আচরণ নিয়েও হতাশা তৈরি হচ্ছিলো। "কারণ তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দুই পক্ষ ২৪ ঘণ্টা কথা বলবেন এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সব ইস্যু নিয়েই কথা হবে। কিন্তু বৈঠক শুরুর পর তিনি সেসব কথা রাখেনি। তিনি বরঞ্চ নিজেকে তার ঘরের ভেতর বন্দি রেখেছিলেন।"
মি বারাক শুধু প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সাথে কথা বলতেন। চেয়ারম্যান আরাফাতের সাথে মাত্র একবার অল্প সময়ের জন্য দেখা করা ছাড়া তিনি কথাই বলতেন না। মীমাংসা আলোচনায় তিনি থাকতেনই না। ফিলিস্তিনীরা যখন সেটা দেখলো তারা তখন সিদ্ধান্ত নিলো কোনো কিছুতেই তারা রাজী হবেনা।
"প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন খুবই হতাশ হয়ে পড়লেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, বৈঠকে কোনো অগ্রগতিই হচ্ছেনা।"
১৫ দিন ধরে বৈঠক চলার পরও কোনো বোঝাপড়াই হলোনা। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন মাঝে মধ্যেই আসতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল যেটুকু ছাড় ফিলিস্তিনীদের দিতে চাইলো তা ফিলিস্তিনীদের সর্বনিম্ন প্রত্যাশার চেয়েও কম ছিলো। দু হাজার সালের ১৫ ই জুলাই দুপক্ষ পরস্পরকে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করে ক্যাম্প ডেভিড ছেড়ে চলে গেল। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের জন্য সেটা বড় ধরনের ব্যর্থতা ছিল
"প্রেসিডেন্ট প্রচণ্ড রকম হতাশ হয়েছিলেন। মীমাংসা চলাকালে প্রেসিডেন্ট অনেক সময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলতেন, কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করতেন না। ভদ্রতা ধরে রাখতেন। বৈঠক ভেঙ্গে পড়ার পর তিনি মি আরাফাতকে বলেছিলেন, আমার ইচ্ছা ছিল আপনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাবেন এবং আল আকসায় ফিলিস্তিনী পতাকা ওড়ানোর দিন আমি আপনার পাশে থাকবো। কিন্তু কি করা উচিৎ আর উচিৎ নয় - আমি অবশ্যই তা চাপিয়ে দেব না। এটা আপনার সমস্যা, আপনার জাতি, আপনার ইতিহাস। আমি শুধু আপনাকে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু আমি তা পারলাম না।"

ছবির উৎস, DAVID SCULL
ক্যাম্প ডেভিডের বৈঠক থেকে কোনো মীমাংসা হলো না। কিন্তু আগের যে কোনো বৈঠকের চেয়ে অনেক বেশি বিষয় নিয়ে ব্যাপক কথা হয় সেখানে। কিন্তু এতদিন পর গামাল হেলাল সেই শীর্ষ বৈঠককে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
"একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আমি বিশ্বাস করি দুপক্ষের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে একটি স্থায়ী শান্তির পথ নিতে আমাদের ক্ষমতার মধ্যে যা করার ছিল তা করার চেষ্টা আমরা করেছিলাম। আমরা পারিনি। কিন্তু আমরা যা পেরেছিলাম তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কারণ আমি বিশ্বাস করি ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনীদের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তির সবচেয়ে বড় সুযোগ তখন তৈরি হয়েছিল। ঐ সুযোগ আর আসবে বলে আমি মনে করিনা। "
এর পরেও আমেরিকা দুই পক্ষের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের আরো অনেকবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
বিশ বছর ধরে আমেরিকার সরকারে কাজ করার পর ২০১০ সালে গামাল হেলাল অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে ওয়াশিংটনে তার নিজের একটি কনসালটেন্সি বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
শাকিল আনোয়ার, বিবিসি বাংলা