ভারতে মেয়ের হত্যাকান্ডে খালাস পেলেন বাবা-মা

ছবির উৎস, MANAN VATSYAYANA
ভারতে প্রায় বছরদশেক আগেকার একটি সাড়া-জাগানো হত্যাকাণ্ডের মামলায় নিহত কিশোরীর বাবা-মাকে খুনের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে আদালত।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট এদিন তাদের রায়ে বলেছে তারা ওই ডাক্তার দম্পতি, রাজেশ ও নুপুর তলোয়ারকে 'বেনিফিট অব ডাউট' দিচ্ছেন, কারণ তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি যে ওই অপরাধ তারাই করেছিলেন।
ওই দম্পতির বিরুদ্ধে সিবিআই যে সব তথ্যপ্রমাণ পেশ করেছিল, তার সবই 'পারিপার্শ্বিক' বলে আদালত এদিন মন্তব্য করেছে।
২০০৮ সালের গোড়ার দিকে দিল্লির উপকণ্ঠে নয়ডার অভিজাত এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে প্রথমে আরুশির মৃতদেহ ও তার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ওই ফ্ল্যাটেরই ছাদ থেকে তাদের অনেক বছরের গৃহপরিচারক হেমরাজের মৃতদেহ উদ্ধার - এই জোড়া হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যে পরিমাণ নিউজপ্রিন্ট আর এয়ারটাইম খরচ হয়েছে তার নজির বিরল।
অন্তত দুটি বলিউড সিনেমাও তৈরি হয়েছে এই হত্যাকান্ডের কাহিনীকে কেন্দ্র করে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক অভিরুক সেন এই ঘটনা নিয়ে একটি বই-ও লিখেছেন।

ছবির উৎস, PRAKASH SINGH
দফায় দফায় তদন্ত, আদালতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য ও দীর্ঘ শুনানির শেষে ২০১৩ সালের নভেম্বরে সিবিআই আদালতের বিচারক রায় দিয়েছিলেন ওই ঘটনায় আরুশির বাবা-মাই দোষী।তাদের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজাও দেওয়া হয়।
কিন্তু আজ এলাহাবাদ হাইকোর্টে নিম্ন আদালতের দেওয়া সেই রায় খারিজ হয়ে গেছে।
সে দিন থেকেই তলোয়ার দম্পতি দিল্লির কাছে উত্তরপ্রদেশের ডাসনা জেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন।তবে এখন তারা অচিরেই মুক্তি পেতে চলেছেন।
এই মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই বলেছে, তারা এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবে কি না তা রায় খুঁটিয়ে পড়ে দেখার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গত চার বছর ধরে জেল খাটা নুপূর তলোয়ারের বৃদ্ধ বাবা-মা আজকের রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন তারা দেশের বিচারবিভাগকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন।
কিন্তু আরুশি-হেমরাজ হত্যাকান্ডে কী এমন ঘটেছিল, যাতে এই সন্দেহের আঙুল উঠেছিল যে বাবা-মা নিজের একমাত্র সন্তানকে পর্যন্ত হত্যা করেছেন? আর শুধু সন্দেহই নয়, নিম্ন আদালতও সেই অভিযোগ মেনে নিয়েছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ক্রিমিনোলজিস্ট হিসেবে বহুদিন যুক্ত ছিলেন ড: তপন চক্রবর্তী - আরুশি মামলায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে সাক্ষ্যও দিয়েছেন তিনি।

ছবির উৎস, STRDEL
বিবিসিকে ড: চক্রবর্তী সে সময় বলছিলেন, "সমাজের একেবারে উঁচুতলায় বিকৃত যৌনতা-সহ নানা ধরনের অভ্যাস, একমাত্র মেয়েকে বাড়িতে রেখে ক্লাবে যাওয়া এবং অনেক বেশি রাতে অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ফেরা - বাবা-মার এসব আচরণের বিরাট মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর!"
এক্ষেত্রে মেয়েটি (আরুশি) যেহেতু বয়:সন্ধিতে ছিল - তাই এর জেরে সে নিজেও নানা অবৈধ কাজকর্মে জড়িয়ে পড়েছে, অথবা বাড়ির পরিচারক বা অন্য কারও সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছে - এমনটাও হওয়া সম্ভব বলে ড: চক্রবর্তীর ধারণা।
ফলে অপরাধ-বিশেষজ্ঞ তপন চক্রবর্তীর মতে, নানা কারণেই মি ও মিসেস তলোয়ার এমন চরম পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারেন - এমন ধারণা তৈরি হওয়ার সঙ্গত কারণও ছিল।
"হয়তো তারা পরিচারকের সঙ্গে নিজের মেয়েকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেছিলেন। আবার উল্টোদিকে এমনটাও হতে পারে আরুশি হয়তো তার বাবা-মার এমন কিছু গোপন কথা জেনে ফেলেছিল যেটা সামাজিক বা পারিবারিকভাবে তাদের পক্ষে চরম অসম্মানজনক হত", বছরচারেক আগে বিবিসিকে বলেছিলেন তিনি।
কিন্তু যেহেতু এর কোনও সম্ভাবনাই অকাট্য প্রমাণ-সমেত আদালতে সিবিআই পেশ করতে পারেনি, এলাহাবাদ হাইকোর্ট তাই রাজেশ ও নুপূর তলোয়ারকে অব্যাহতি দিয়েছে।
তবে আজকের রায়ের পরেও আরুশি-হেমরাজের হত্যাকারী কারা, তার উত্তর কিন্তু আদৌ মিলল না এবং এই জোড়া হত্যাকান্ডের পুরো ঘটনাপরম্পরা কী ছিল, সেটাও স্পষ্ট হল না।
আমাদের পেজে আরও পড়ুন :








