বছরে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ মারা যায়, তার অর্ধেকের মৃত্যু মরফিনের অভাবে। মৃত সন্তান প্রসব ঠেকাতে নারীদের কাত হয়ে ঘুমানোর পরামর্শ
সারা পৃথিবীতে প্রত্যেক সেকেন্ডে প্রায় দু'জন মানুষের মৃত্যু হয়। এক ঘণ্টায় মারা যায় সাড়ে ছয় হাজারের মতো মানুষ। আর একদিনে মৃত্যু হয় দেড় লাখেরও বেশি মানুষের।
সেই হিসেবে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ মারা যায় এক বছরে। বুঝতেই পারছেন, এটুকু পড়তে পড়তেই কিন্তু বহু মানুষের মৃত্যু হয়ে গেছে।
সম্প্রতি চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মৃত্যুর অর্ধেক, অর্থাৎ বছরে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের মৃত্যু হয় ব্যথায়, শুধুমাত্র ব্যথানাশক ওষুধ মরফিনের অভাবে।
দরিদ্র দেশগুলোতে এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
ব্রিটেনে বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী দ্যা ল্যানসেটের উদ্যোগে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। সেখানে দেখা গেছে, ধনী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মরফিনের অপব্যবহার খুব বেশি আর নাইজেরিয়ার মতো দেশে এই ব্যথানাশক খুবই দুষ্প্রাপ্য।
এই গবেষণার সাথে জড়িত একজন গবেষক ফেলিশা নর্ল বলেছেন, মরফিন সবার কাছে সহজলভ্য করতে খুব বেশি খরচের প্রয়োজন হবে না।
"এই ব্যথানশক ব্যবহার করতে পারা একটি মানবাধিকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যাদের এই ওষুধের দরকার তাদের সবার কাছে মরফিন পৌঁছে দিতে বছরে খরচ হবে মাত্র সাড়ে চৌদ্দ কোটি ডলার। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে মাঝারি আকারের একটি হাসপাতাল চালানোর খরচের খুব সামান্যই একটি অংশ।"
চিকিৎসায় মরফিনের ব্যবহার নিয়ে শুনুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রিন্সিপাল এবং মেডিসিন বিভাগের প্রধান খান আবুল কালাম আজাদের সাক্ষাৎকার।
শুনতে চাইলে উপরের অডিও লিঙ্কে ক্লিক করুন।
মৃত সন্তান প্রসব ঠেকাতে নারীদের কাত হয়ে ঘুমানোর পরামর্শ এক গবেষণায়
মৃত সন্তান প্রসব প্রতিরোধে সন্তানসম্ভবা নারীদেরকে একপাশে কাত হয়ে শোওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গর্ভধারণ কালের শেষ তিন মাস সম্ভাব্য মায়েদেরকে এভাবেই ঘুমাতে পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

ছবির উৎস, Science Photo Library
ব্রিটেনে প্রায় এক হাজার নারীর ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পিঠের ওপর চিৎ হয়ে ঘুমালে মৃত শিশু জন্মদানের ঝুঁকি দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
গবেষণায় ২৯১ জন গর্ভবতী নারীর উপর নজর রাখা হয়েছিলো যারা মৃত শিশুর জন্ম দিয়েছেন এবং ৭৩৫ জন নারী জন্ম দিয়েছে জীবিত শিশুর।
এই সমীক্ষার পর গবেষকরা বলছেন, নবজাতকের স্বাস্থ্যের সাথে সম্ভাব্য মা কিভাবে ঘুমাচ্ছেন তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এবং ঘুমানোর এই ভঙ্গিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তারা এও বলছেন, ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর সন্তানসম্ভবা নারী যদি দেখেন যে তারা তাদের পিঠের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন তাহলে দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়।
ব্র্যাডফোর্ডের একজন নারী গ্রেইস, প্রেগনেন্সির ৩৫ সপ্তাহের মাথায় তার সন্তানকে হারিয়েছেন। তিনি বলছেন, "আমি জানতাম কিছু একটা ভুল হয়েছে। একদিন ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারলাম কিছু একটা হয়েছে। আমি হাসপাতালে ছুটে গেলাম। তারা মনিটর অন করে সেখানে শিশুর হার্টবিট খুঁজে পেল না। আমার জীবনের খুব কষ্টকর মুহূর্ত ছিলো সেটি- যখন দেখলাম আমার সন্তান তার জন্মের আগেই মারা গেছে।"
গ্রেইস এখনও জানেন না কি কারণে তার গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু হয়েছিলো।
যুক্তরাজ্যে এক গবেষণায় দেখা গেছে ২২৫টি গর্ভধারণের ক্ষেত্রে একটি মৃত শিশুর জন্ম হয়। বলা হচ্ছে, সম্ভাব্য মা যদি একপাশে কাত হয়ে ঘুমাতে যান তাহলে বছরে ১৩০টির মতো নবজাতকের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
ব্রিটিশ জর্নাল অফ অবসটেট্রিক্স এন্ড গাইনোকলজি এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছে।

ছবির উৎস, Getty Images
এর আগে নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়াতেও একই ধরনের গবেষণাতেও সন্তানসম্ভবা মায়েদেরকে প্রায় একই রকমের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিলো।
ম্যানচেস্টারে এই গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক প্রফেসর আলেকজান্ডার হেজেল এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, গর্ভবতী নারীদেরকে যে প্রশ্নটি করা হয়েছে সেটি হলো- তারা কি পজিশনে ঘুমাতে গিয়েছিলেন।
"এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই অবস্থানেই তিনি সবচেয়ে বেশি সময় কাটান। আর ঘুম থেকে উঠার পর নিজেকে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে দেখলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কারণ ওই পজিশন নিয়ে কিছু করার আর কোন সুযোগ নেই। কিন্তু কি পজিশনে ঘুমাতে যাচ্ছেন সেবিষয়ে নারীরা অনেক কিছু করতে পারেন।
চিৎ হয়ে কিম্বা উপুড় হয়ে ঘুমালে মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি কেন বেড়ে যায় সেবিষয়ে গবেষকরা এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।
কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে- নারীরা যখন পিঠের উপর শুয়ে থাকে তখন শিশু এবং গর্ভাশয় এই দুটোর মোট ওজন রক্তনালীগুলোর ওপর চাপ তৈরি করে। এর ফলে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে রক্ত এবং অক্সিজেনের প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে।
একপাশে কাত হয়ে কিভাবে ঘুমানো যায় তার কিছু পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা:
- আপনি যখন ঘুমাতে বিছানায় যাবেন তখন আপনার পিঠের পেছনে কয়েকটি বালিশ রেখে দিন যাতে একদিকে কাত হয়েই ঘুমাতে হয়।
- রাতের বেলা হঠাৎ যদি আপনার ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে একবার দেখে নিন আপনি কি পজিশনে ঘুমিয়ে আছেন, তারপর আবার একপাশে কাত হয়ে ঘুমাতে চলে যান।
- দিনের বেলায় ঘুমাতে গেলেও, যদি সেটা খুব অল্প সময়ের জন্যেও হয়, তখনও আপনি রাতের বেলায় ঘুমাতে যাওয়ার মতো শরীরের পজিশনকে গুরুত্ব দিন।
- ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর যদি দেখেন চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন, তাহলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। সাথে সাথেই একপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ুন।
তবে ডান দিকে বা বাম দিয়ে কাত শোওয়ার মধ্যে গবেষণায় কোন পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞানের আসর পরিবেশন করেছেন মিজানুর রহমান খান।

