ডেঙ্গু পরিস্থিতি: সংকটের চেয়ে কী গণমাধ্যমের খবর নিয়েই কি সরকার বেশি চিন্তিত?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
- Published
বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। আর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বলা হচ্ছে ২৯ জন। দেশটিতে মানুষের মাঝে আতংক বা উদ্বেগ কমছে না।
তবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং মৃত্যুর খবর নিয়ে গণমাধ্যম যে খবর প্রকাশ করছে, সে ব্যাপারে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সমালোচনা করা হয়েছে।
সরকারের অনেকে মনে করছেন, এখনকার পরিস্থিতিতে কিছু গণমাধ্যম এবং সামাজিক নেটওয়ার্কে অনেকের মতামত আতংক বাড়াচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলেছেন, সঠিক খবর প্রকাশ না হলে, তখন গুজব সৃষ্টি হবে।
প্রতিদিনই দুই হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সরকারি হিসাবেই এই চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
যদিও বেসরকারি হিসাবের তুলনায় সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম বলা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অনেকে পরিস্থিতিকে মহামারি হিসেবে বর্ণনা করছেন। কিন্তু সরকার পরিস্থিতিকে মহামারি হিসেবে দেখতে রাজি নয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ঢাকার মেয়ররা এবং সরকারের অনেকে গণমাধ্যমের সমালোচনা করেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, কিছু গণমাধ্যমে এমন খবর প্রচার বা প্রকাশ করা হচ্ছে, যা আতংক বাড়াচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমেও অনেকে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও সরকারের অনেকে অভিযোগ করছেন।
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
বেসরকারি টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনের বার্তা বিভাগের প্রধান মোস্তফা ফিরোজ বলছিলেন, সরকারের অনেকে বিষয়টাকে রাজনৈতিকভাবে দেখছেন, সেকারণে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলছেন।
"আমরা দেখছি বিভিন্নক্ষেত্রে সরকারের জবাবদিহিতার অভাব আছে। আর ডেঙ্গুর কারণে যেহেতু মানুষ মারা যাচ্ছে,ফলে মানুষ মারা যাওয়ার এই খবর যত প্রচারিত হবে, সরকার হয়তো ভাবছে যে, তাতে তাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়বে।"
তিনি আরও বলেছেন, "আমি মনে করি, গণমাধ্যম দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করছে বলে মানুষ সচেতন হচ্ছে। আর সামাজিক মাধ্যমে কিন্তু একে অপরকে ডেঙ্গু ঠেকাতে বা হলে কি করতে হবে, সেটা প্রচার করছে। গণমাধ্যমও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য প্রচার বা প্রকাশ করে মানুষকে সাহায্য করছে।"
"যেহেতু সরকারের নীতিনির্ধারক মহল থেকে বার বার বলা হচ্ছে,যে মিডিয়াগুলো উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। ফলে মিডিয়াগুলো সেলফ সেন্সরশিপের দিকে চলে চলে যাচ্ছে। এটা কাম্য নয়।"
দু'দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। একইসাথে তিনি বলেছেন, সংবাদগুলো যখন বেশি আসে, মানুষ আতংকিত হয়ে পড়ে।আর সেটাই সমস্যা সৃষ্টি করছে বলে তিনি মনে করেন।
সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, তারাও একই ধারণা পোষণ করেন।
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

এদিকে, সামাজিক মাধ্যমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে র্যাব দু'জন গ্রেফতার করেছে বুধবার রাতে।
সরকারের দিক থেকে পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরণের রাখঢাক করার চেষ্টা রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলছিলেন, সঠিক খবর প্রকাশ না হলে, তখন গুজব সৃষ্টি হয়।
"গণমাধ্যমের কাজই তো মানুষকে তথ্য সরবরাহ করা।তো ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে একটা তৈরি হয়েছে।এখানে গণমাধ্যম যদি তথ্য সরবরাহ না করে বা অস্বীকার করে, তাহলেই বরং মুখে মুখে গুজব ছড়াবে। আতংকও বাড়বে।"
"এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতাটা শেয়ার করে। সেক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রে এবং গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও যদি সরকারের মনে হয় যে,পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্নভাবে খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। তাহলে এক্ষেত্রে সরকারেরই তো তথ্য দেয়া উচিত। বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পেলে অন্যকিছু মানুষ বিশ্বাস করবে না।"
সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে গণমাধ্যমের সমালোচনা করা হলেও তথ্যমন্ত্রী ড: হাছান মাহমুদ বলেছেন, গুটি কয়েক সংবাদমাধ্যমে ভিন্নভাবে খবর প্রকাশ করা হচ্ছে।
"আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, গণমাধ্যম ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করার জন্য আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন টেলিভিশনকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল এবং সেগুলো তারা প্রচার করেছে। সেক্ষেত্রে অর্থাৎ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে বা আক্রান্ত না হওয়ার জন্যে যে সচেতনতা তৈরি করা দরকার, সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ গণমাধ্যম সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে সার্বিকভাবে। দু'একটি গণমাধ্যম ভিন্নভাবে সংবাদ প্রচার করেছে।"

" আমাদের দেশে সামাজিক গণমাধ্যমকে গুজব তৈরি করার জন্য ব্যবহার করা হয়। যেমন ছেলেধরা আতংক, তারপর পদ্মা সেতুতে শিশু বলি দেয়ার আতংক-এগুলো কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই তৈরি করা হয়েছিল। যে চক্রটি এগুলো করেছিল, সেই চক্র কিন্তু এখনও সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।তারা ডেঙ্গু নিয়েও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছে।"
গণমাধ্যম কর্মীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, মৃত্যুর খবর দেয়া বা হাসপাতাল পরিস্থিতি নিয়ে লাইভ করার ক্ষেত্রে সরকারের আপত্তি রয়েছে। সেজন্য সেলফ সেন্সর হচ্ছে।
এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, "হাসপাতালের ভিতর থেকে লাইভ করা কতটা সমীচীন, এনিয়ে আমারও প্রশ্ন আছে। কারণ ইংল্যান্ডে কিন্তু হাসপাতালের ভিতরে গিয়ে এভাবে লাইভ করতে পারে না। কারও মৃত্যু হলে সেই সংবাদ তো পরিবেশন করবে।''
''কিন্তু হাসপাতালের ভিতরে গিয়ে দেখালে তো মানুষের মাঝে আতংক বাড়বে। সেটি সবক্ষেত্রে হচ্ছে, তা নয়। কেউ কেউ করছে।কারও কারও জন্য পুরো গণমাধ্যমকে দোষারোপ করা যাবে না।"








