পাকিস্তানের টালমাটাল রাজনীতি: ইমরান খানের ভাগ্য সুপ্রিম কোর্টের হাতে

ইমরান খান: ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী
ছবির ক্যাপশান, ইমরান খান: ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী
Published

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভবিষ্যৎ এখন সুপ্রিম কোর্টের হাতে।

তার বিরুদ্ধে আনা বিরোধীদের অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোট আটকাতে রোববার তার দল পিটিআই পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেয়, এবং মি খান আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

ক্ষিপ্ত বিরোধী জোট সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। এখন জানা যাচ্ছে যে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া বৈধ ছিল কিনা তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মঙ্গলবার রায় দিতে পারে।

ইমরান খান অভিযোগ করছেন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য এই অনাস্থা ভোট আমেরিকানদের একটি চক্রান্ত, যদিও যুক্তরাষ্ট্র এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এর আগে রবিবার ইমরান খানের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে একটি অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও - যেই ভোটে তিনি শোচনীয় ভাবে পরাজিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল - পার্লামেন্টের স্পিকার কাসিম সুরি বিরোধী দলগুলোর জোটের অনাস্থা ভোট করার দাবি নাকচ করে দেন। পরে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেন।

পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দায়িত্ব নেয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় মন্ত্রিসভা বাতিল করে দিয়েছেন। অনাস্থা ভোট আয়োজনের প্রক্রিয়াকে 'সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশী ষড়যন্ত্র' হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইমরান খান।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের উত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদের পুরোটা সময় দায়িত্বে থাকতে পারেননি।

আরো পড়তে পারেন:

পাকিস্তানের কোন প্রধানমন্ত্রী আজ পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়ে ইমরান খানকেও আগাম নির্বাচনের দিকে যেতে হচ্ছে।
ছবির ক্যাপশান, পাকিস্তানের কোন প্রধানমন্ত্রী আজ পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়ে ইমরান খানকেও আগাম নির্বাচনের দিকে যেতে হচ্ছে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জোট স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রমকে অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিরোধী দলগুলোর জোট বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের রাস্তা উপায় খুঁজতে যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে।

রবিবার মন্ত্রিসভা রদ হওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে ইমরান খান আর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না।

তবে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত ইমরান খানই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও বিরোধী জোটের নেতা শাহবাজ শরিফকে এরই মধ্যে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের বাইরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি জানান যে এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক ডাকা হতে পারে।

তিনি জানান প্রধান বিচারপতির বিশেষ ক্ষমতা অনুযায়ী তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন যে জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক ডাকা হবে কিনা।

পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটিতে সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান কর্মকর্তারা রয়েছেন।

রবিবার পাকিস্তানের সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর মহাপরিচালক জেনারেল বাবর ইফতিখার বলেছেন যে রবিবার পাকিস্তানের সংসদে যা ঘটেছে তার সাথে সেনাবাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই।

আরো পড়তে পারেন:

ইমরান খানের বিরুদ্ধে নওয়াজ শরীফের সমর্থকদের একটি বিক্ষোভ। ফাইল ছবি
ছবির ক্যাপশান, ইমরান খানের বিরুদ্ধে নওয়াজ শরীফের সমর্থকদের একটি বিক্ষোভ। ফাইল ছবি

আলোচনায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি বিরোধী জোটের নেতা শহবাজ শরিফের

পাকিস্তানের সংবিধানের ২২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অনুচ্ছেদ ৫৮ এর অধীনে সংসদ বাতিল হয়ে গেলে দেশের প্রেসিডেন্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার সাথে আলোচনা করে।

কিন্তু বিরোধী দলগুলোর জোট ও পিএমএল-এন নেতা শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের আলোচনায় অংশ নেবেন না।

তিনি বলেছেন 'সংবিধানের লঙ্ঘনকারীদের যতক্ষণ পর্যন্ত শাস্তির আওতায় না আনা হচ্ছে' ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আলোচনায় বসবেন না। ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনার সময় এ মন্তব্য করেন তিনি।

জেইউআই-এফ এর নেতা আসাদ মাহমুদও বলেছেন যে বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নেবে না।

এরই মধ্যে পাকিস্তানের সাবেক তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী জানিয়েছেন যে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে দুইজনের নাম পাঠিয়েছেন।

ফাওয়াদ চৌধুরীর মতে, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

ইমরান খান অভিযোগ করছেন তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য ‌'আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র' চলছে।
ছবির ক্যাপশান, ইমরান খান অভিযোগ করছেন তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য ‌'আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র' চলছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী কীভাবে নির্বাচিত হবেন

প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের তেমন নেই, বরং প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার ঐক্যমতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট।

অনুচ্ছেদ ২২৪ অনুযায়ী, বাতিল হয়ে যাওয়া সংসদের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার মধ্যে একজনকে নিয়োগের বিষয়ে ঐক্যমত্য হতে হবে।

মন্ত্রিসভা রদ হওয়ার তিন দিনের মধ্যে এই নিয়োগ দিতে হবে।

নতুন নাম নির্ধারিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট সেই নাম অনুমোদন করবেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে থাকবেন।

যদি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা - বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইমরান খান ও শাহবাজ শরিফ - একজন প্রার্থীর নামের বিষয়ে সম্মত হতে না পারেন, তাহলে এই দায়িত্ব একটি কমিটির ওপর বর্তাবে যেখানে ক্ষমতাসীন দলের চারজন ও বিরোধী দলের চারজন সদস্য থাকতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কমিটি যদি তিনদিনের মধ্যে যে কোনো একজন প্রার্থীর নামের বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারেন, তাহলে নির্বাচন কমিশনের ওপর নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের দায়িত্ব অর্পিত হবে।

এরপর নির্বাচন কমিশনকে দুই দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করতে হবে।

ইমরান খানের সমর্থক
ছবির ক্যাপশান, ইমরান খানের সমর্থকরা গত সপ্তাহে বিশাল এক র‍্যালি আয়োজন করে

দেশদ্রোহিতার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

পাকিস্তানের সংসদের বিরোধী দলের নেতা শাহবাজ শরিফ সংসদের স্পিকার কাসিম সুরি ও প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে 'গুরুতর দেশদ্রোহিতা'র অভিযোগ তুলেছেন এবং বলেছেন যে দু'জনকেই পাকিস্তানের সংবিধানের 'অনুচ্ছেদ ৬' এর অধীনে দেশদ্রোহিতার দায়ে অভিযুক্ত করা উচিত।

অন্যদিকে ইমরান খানের দল পিটিআই'এর নেতারাও দলের বিদ্রোহী সদস্যদের 'বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে অভিযোগ করছেন।

পাকিস্তানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী: "যদি কেউ জোর প্রয়োগ করে, কোনো অসাংবিধানিক পন্থা অবলম্বন করে সংবিধানের বিলোপ, বাতিল, স্থগিত বা সাময়িকভাবে স্থগিত করে বা তেমন কিছু করার চেষ্টা করে, তাহলে ঐ ব্যক্তি ও তার সহযোগীরা দেশদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হবেন।"

বিচারপদি এস এম জাফরের মতে, 'দেশদ্রোহিতা' শব্দটি পাকিস্তানের সংবিধানে প্রথমবার ব্যবহৃত হয় ১৯৭৩ সালে। তবে এই সংজ্ঞা সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর পর পরিবর্তিত হয়।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে পাকিস্তানে সম্প্রতি ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে মানুষ
ছবির ক্যাপশান, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে পাকিস্তানে সম্প্রতি ব্যাপক বিক্ষোভ করেছে মানুষ

ইমরান খান কি ক্ষমতা রক্ষায় ধর্মকে ব্যবহার করছেন?

পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত কিছুদিন ধরে রাস্তায় বিক্ষোভ হলেও ইমরান খান ও বিরোধী জোটের নেতা দুজনই ধর্মকে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য ব্যবহার করছেন বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৮ সালে ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বিভিন্ন সময় তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে পাকিস্তানকে মদিনা সনদের মূলনীতি অনুযায়ী পরিচালনা করবেন তিনি।

লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক আলি কাসমির মতে, ক্ষমতায় আসার পর ইমরান খান ধর্মকে নতুন আঙ্গিকে এবং নতুন মোড়কে পাকিস্তানের রাজনীতিতে উপস্থাপন করেন। ইমরান খানের এই পন্থার সমালোচনা করলেও বিরোধী দলের জোটগুলো বাধ্য হচ্ছে তাদের রাজনীতিতে 'মদিনা সনদের মূলনীতি'র উল্লেখ করতে।

অনাস্থা ভোটের প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও বিরোধী নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান দুজনেই তাদের বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন
ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে সবসময়ই অভিযোগ ছিল যে তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন নির্বাচনের কথা চিন্তা করেই ধর্মকে তারা ব্যবহার করছেন - কারণ এর আগের নির্বাচনে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-লাবাইক বিপুল ভোট পেয়েছিল।

অধ্যাপক আলি কাসমি মন্তব্য করেন, "আমরা এমন একটা বাস্তবতার মধ্যে আছি যেখানে প্রতিযোগিতা নির্ভর করবে ধর্মকে কারা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতে পারবে, তার ওপর।"

লেখক ও গবেষক আয়শা সিদ্দিকা বলেন, "ধর্মকে যে ব্যবহার করতে পারবে, তুরুপের তাস তার হাতেই থাকবে।"

"পাকিস্তানের রাজনীতির ধরণই এরকম, কারণ ধর্ম বাদে মানুষকে আমরা আর কিছু দিতে পারি না। পাকিস্তানে পিএমএল-এন, জেইউআই ও পিটিআই - সব দলই ধর্মকে ব্যবহার করেছে।"

পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে ইমরান খানের জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়লেও পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখনো ইমরান খানকে একটি বড় শক্তি বলেই মনে করা হচ্ছে।