ছিনতাই আতঙ্ক বনাম ফুটবলের আনন্দ

- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা
- Published
দক্ষিণ আফ্রিকায় অপরাধ প্রবণতা নিয়ে বিশ্বকাপের আগে এবং এখনও দুনিয়াজোড়া মিডিয়ায় যে পরিমাণ লেখালেখি হয়েছে তা বলার নয়৻
আশঙ্কাটা কিছুটা অতিরঞ্জিত, আবার যা রটে তার কিছুটা তো বটেও – ছুটকোছাটকা ছিনতাই বা রাস্তায় একা পেয়ে লুটপাটের ঘটনা যে কানে আসছে না তা নয়৻
জোহানেসবার্গের মেলভিল শহরতলিতে ব্রিটিশ এক সংবাদমাধ্যমের দুই কর্মীর কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে পকেটের টাকাপয়সা, ক্রেডিট কার্ড লুট হল তো এই সেদিন!
তো তাই বলে কি বিশ্বকাপ থেমে আছে? মোটেও না৻ দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ বা বিশ্বকাপের উদ্যোক্তারা বারবার যেটা বলছেন, তা হল দেশের সব জায়গাতেই ছিনতাইবাজরা ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্যাপারটা মোটেও তা নয় – যদি একটু সতর্ক হয়ে ক্রাইম হটস্পটগুলো এড়িয়ে চলা যায়, অযথা রাতবিরেতে ঝুঁকি না নেওয়া হয় তাহলে নিশ্চিন্তে ফুটবল উপভোগ করতে কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়৻
সারা দুনিয়া থেকে আসা হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমীর বেশিরভাগেরই হচ্ছেও না৻
মুশকিল একটাই, ক্রাইম হটস্পটগুলো বিদেশি পর্যটকরা চিনবেন কীভাবে? এখানেও উদ্যোক্তাদের সহজ উত্তর, নিজের কমন সেন্সটা প্রয়োগ করুন !

দক্ষিণ আফ্রিকার বড় শহরগুলোতে হাঁটাহাঁটির কোনও রেওয়াজ নেই – লোকে দুচারশো মিটার রাস্তা যেতেও নিজেদের ড্রাইভ থেকে হুশ করে ল্যান্ডক্রুজার বের করে নিতে অভ্যস্ত – সেখানে আপনি, বিদেশি অতিথি, যদি শুনসান রাস্তা দিয়ে আপনমনে হাঁটতে থাকেন তাহলে ক্রিমিনালদের জন্য তার চেয়ে সহজ টার্গেট আর কে হতে পারে?
এই বিরাট সমস্যার দারুণ একটা সমাধান বের করেছে দেখলাম ডারবান৻ জোহানেসবার্গ বিরাট ছড়ানো শহর, কোনাকুনি শহরের এক মাথা থেকে আর এক মাথা যেতে কমকরে পঞ্চাশ মাইল – এত বড় শহরে পুলিশি টহল দিয়ে সবাইকে নিরুপদ্রব রাখা প্রায় অসম্ভব৻
আর ডারবান বড় শহর হলেও বিশ্বকাপের যাবতীয় ফুর্তি এনে ফেলেছে শহরের মাইলখানেক লম্বা সোনালী বেলাভূমিতে – সেখানে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদর সতর্ক নজরদারিতে ফুটবল আর আনুষঙ্গিক বিনোদনের নিশ্চিন্ত আয়োজন৻
ভারত মহাসাগরের তীরে ডারবানের গোল্ডেন মাইল এমনিতেই বিশ্ববিখ্যাত – সোনালী বালুতে মোড়া এই মাইলখানেক লম্বা সমুদ্রতটের আকর্ষণে সারা দুনিয়া থেকে পর্যটক আর সি-সার্ফাররা এই কোয়াজুলু নাটালে ছুটে আসেন!

দক্ষিণ আফ্রিকার এই শীতে ডারবান এমনিতেই সারা দেশে সবচেয়ে উষ্ণ শহর, জাঁক করে তারা বলছেও দ্য ওয়ার্মেস্ট প্লেস টু বি – আর সেই উষ্ণতার পরশ নিতে দেশবিদেশের ফুটবলপ্রেমীরা ভিড়ও জমাচ্ছেন এই শহরেই৻
গোল্ডেন মাইলের এক মাথায় বিশ্বকাপের জন্য তৈরি ডারবানের নতুন স্টেডিয়াম – যার নাম মোজেস মাভিদা৻ লন্ডনের ওয়েম্বলির মতোই স্টেডিয়ামের মাথায় বিশাল এক টায়রা, আর ফানিকিউলারে চেপে সোজা চলে যাওয়া যায় স্টেডিয়ামের টঙে – দেখা যায় শহর আর সাগরের স্বর্গীয় দৃশ্য৻
স্টেডিয়াম থেকে কয়েকশো মিটারের মধ্যে সোনালী সৈকত – ম্যাচে আপনার টিম হারুক বা জিতুক, সটান এসে বিচ পার্টিতে ঢুকে পড়তে কোনও বাধা নেই৻ কিংবা ঠিক পাশেই সানকাস্ট ক্যাসিনো – যা আপনার অভিরুচি!
শহরের বড় বড় সব হোটেল-গেস্ট হাউসও এই সাগরের ধার ঘেঁষেই৻ ঘর থেকে একছুটে বিচ – আবার ঘরে ফেরত যাওয়া কয়েক সেকেন্ডের মামলা৻

গোল্ডেন মাইলেও দিনভর কনসার্ট, হইচই, বিচ ভলিবল বা বিচ ফুটবল, সি-ফুড রেস্তোরাঁর মনমাতানো খাবার – সব একদম হাতের নাগালে৻ বিচের আর এক মাথায় ফিফার ফ্যান ফেস্টিভ্যাল – বিশাল পর্দায় বিশ্বকাপের টাটকা ম্যাচের উত্তেজনা!
সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হল, এই মাইলখানেক এলাকায় গিজগিজ করছে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা – তাদের সতর্ক নজরদারিতে নিশ্চিন্তে সবাই গা ভাসাতে পারছে অনাবিল ফুটবল বিনোদনে৻
বিশ্বকাপ যে শহরে হবে, রাতারাতি সেই শহরের সব সমস্যা ঘুচিয়ে তাকে নিখুঁত করে তোলা সম্ভব নয় এটা সবাই জানে৻ কিন্তু ডারবান মডেল চমৎকার একটা জিনিস – শহরের মধ্যে এ যেন একটুকরো দ্বীপ, যেখানে ক্রীড়াপ্রেমীদের আর কিছু নিয়ে না-ভাবলেও চলে, বিশ্বকাপের মজাটা নিংড়ে নেওয়া যায় শেষ বিন্দু পর্যন্ত৻








