বিবিসির সরেজমিন প্রতিবেদন - ৬
- Author, শুভজিৎ বাগচী
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লী
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
পর্ব - ৬
বাস্তারের জঙ্গলে সুকলদাই নামে বছর তিরিশের এক মহিলার সঙ্গে আলাপ হলো৻ নারায়ণপুর জেলার কোঙ্গেরা গ্রামের বাসিন্দা৻

সুকলদাই আমায় বলছিলেন, তাঁর অঞ্চলে তিনি মাওবাদী পার্টির মহিলা সংগঠন, ক্রান্তিকারী আদিবাসী মহিলা সংগঠন (কে এ এম এস)-এর সচিব৻ তাঁর অঞ্চলে বিশ-তিরিশ জন মহিলাকে সংগঠিত করার কাজ তিনি করেন৻
পার্টির কাজ করার জন্যে পুলিশ তাঁকে দু’বার গ্রেফতার করেছে৻ বস্তুত, একবার পুলিশে খবর দিয়েছেন তাঁর স্বামী নিজেই৻ পার্টির থেকে কোনও সহায়তাও পাননি সুকলদাই৻ নিজেই বললেন সে কথা৻ বারবার এও বললেন, এসবের পরেও, পার্টি ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই৻
“পার্টিতে থাকার ফলে বেশ কয়েকটি সুবিধা হয়েছে৻ পরিবারের মধ্যে আমাদের উপরে যে অত্যাচার হতো তা অনেকটাই কমেছে৻ এখানে পুরুষরা একাধিক বিয়ে করতো এবং মহিলাদের দিয়ে যাবতীয় কাজ করাতো৻ এছাড়া ছিলো নিয়মিত মারধর করার ঘটনা,” বললেন সুকলদাই৻
পার্টিতে আসার পরে মেয়েদের উপরে অত্যাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে তা নয়৻ কিন্তু অনেকটাই কমেছে৻

“আমার স্বামী আমাকে নকশাল বলে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার সাত মাস পরে আমি জামিন পেয়ে বেরিয়ে এলাম৻ আর আমি বেরিয়ে আসার পরে পার্টি স্বামীকে গিয়ে বলে এলো, আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে বা পুলিশে খবর দিলে তাঁকে এর ফল ভুগতে হবে৻ আমার স্বামী এরপর থেকে অনেকটাই ভদ্র হয়ে গিয়েছেন৻“
কেন মহিলারা পার্টিতে?
দক্ষিণ ছত্তিশগড়ে মাওবাদীদের শিবিরে ছিলাম প্রায় পাঁচ সপ্তাহ৻ এই সময়ে মাওবাদীদের বিশটি শিবিরে গিয়েছি৻ প্রতিটি শিবিরের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সদস্য মহিলা৻ বারবারই আমার মনে হয়েছে এতো বেশি সংখ্যায় মহিলা কেন যোগ দিচ্ছেন একটি সশস্ত্র আন্দোলনে ?
বস্তার জেলার কুদুরগাঁওয়ে একটি বিবাহের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম৻ মাওবাদীদের সামরিক বাহিনী পি এল জি এ-র এক সদস্য সোমুড়ু-র সঙ্গে বিয়ে হচ্ছিলো পার্টির মহিলা কমরেড সুকমতির৻ বন্দুকটিকে বাঁ কাঁধের উপরে রেখে, ডান হাতটি মুঠো করে রেড স্যালুটের ভঙ্গিতে তুলে বিবাহের শপথ নিচ্ছিলেন সুকমতি, সোমুড়ু৻
একটি খাতায় হাতে লেখা ছিলো শপথ বাক্য৻ গোণ্ডি ভাষায় পাঠ করাচ্ছিলেন আর এক কমরেড৻
“বিয়ের পরে আমরা একসঙ্গে থেকে এবং মার্ক্স, লেনিন ও মাওবাদী দর্শনের ভিত্তিতে জনতার হয়ে লড়াই আমরা চালিয়ে যাবো৻ আমরা একমঙ্গে থাকবো ও বিপ্লবের কাজ চালিয়ে যাবো৻ সামন্ততান্ত্রিক ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইও চালিয়ে যাবো৻ ”

বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে ঘন্টাখানেক চললো নাচগান৻ অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে সাংস্কৃতিক শাখার কর্মী রহমতি আমায় যা বললেন সেটা মহিলাদের মাওবাদী পার্টিতে যোগ দেওয়ার দ্বিতীয় কারণ হিসাবে দেখা যেতে পারে৻
“এই যে বিয়েটা দেখলেন এখানে কারও উপরে জবরদস্তি করা হয়নি৻ দু-জনের সম্মতি নিয়ে বিয়েটা হলো৻ আমিও এই ভাবেই বিয়ে করেছিলাম৻ বস্তুত আমি নিজেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম আমার স্বামীকে৻” বলছিলেন রহমতি৻
রহমতি আরও বলছিলেন এরকম একটা ধারণা আছে যে আদিবাসী সমাজে মেয়েদের কথা শোনা হয় বা তাঁদের উপরে অত্যাচার কম হয়৻ এই ধারণাও ভ্রান্ত বলে মনে করেন রহমতি৻
“পার্টিতে মহিলা হিসাবে আমার একটা স্বাতন্ত্র্য বা স্বাধীনতা আছে৻ এখানে বসে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলছি৻ এটা ঘরে বসে করা সম্ভব ছিলো না৻ সেখানে বলা হতো এখন ঘরের কাজ করো৻ এখানে পুরুষদের সঙ্গে একসাথে কাজ করি৻ মনে হয়না কারো গোলাম হয়ে আছি৻ কোনও অভিযোগ থাকে না তা নয়৻ কিন্তু তা নিয়ে আলোচনার যথেষ্ট সুযোগ পার্টিতে থাকে৻”
এই স্বাধীনতা আর খানিকটা স্বর্নিভরতাকে তাঁদের পার্টিতে যোগ দেওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন পার্টির অধিকাংশ মহিলা সদস্য৻
অনূষার বক্তব্য
দক্ষিণ ছত্তিশগড়ে মাওবাদী পার্টির একজন সাধারণ মহিলা কর্মী ভোর পাঁচটা নাগাদ ঘুম থেকে ওঠেন আর রাত ১০টা নাগাদ ঘুমোতে যান৻ এই ১৭ ঘন্টা সময় তিনি সেই সমস্ত কাজই করেন, যা করেন একজন পুরুষ কমরেড৻
বরং আমার মনে হলো অনেক সময়ে মহিলারা হয়তো কিছুটা বেশিই কাজ করেন৻ যেমন, রান্নাবান্নার দিকটা প্রায় পুরোপুরি মেয়েদের দখলে৻ তবে তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা পার্টির সামরিক দিকটা দেখেন না৻ বরং অধিকাংশ সময়েই শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রায় পুরোপুরি ভাবে ছিলো মেয়েদের হাতে৻

আমার নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে অনেকে ছিলেন যাঁরা মহিলা৻ পুরুষ ও মহিলারা পরস্পরের সামনে এতোটাই স্বচ্ছন্দ যে একই শিবিরে রাতে ঘুমোনো থেকে নদীতে স্নান – কখনই অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনও আড়ষ্টতা আমার চোখে পড়েনি৻ এটা কি করে সম্ভব হলো তার একটা সহজ কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উত্তর দিলেন অনূষা৻ অনূষার বয়স ১৬৻
“এখানে আমাদের সম্পর্ক ভাই-বোনের মতো৻ আমাদের এখানে প্রাথমিক কাজ, ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা আর তারপর পার্টির কাজে সাহায্য করা৻ সম্পর্ক বা বিবাহের ব্যাপারটা তাই অতো গুরুত্ব পায় না৻ প্রয়োজন হলে আমরা বিয়ে করে ফেলি৻”
তবে পার্টি মহিলাদের মনে খানিকটা সাহস জোগাতে পারছে বা তাদের খানিকটা স্বনির্ভর করে তুলতে পারছে বলেই তাঁরা মাওবাদী পার্টিতে আসছেন তা নয়৻
“তবে মহিলাদের পার্টিতে আসার প্রকৃত কারণ আমার মতে হলো, সরকারের শান্তি বাহিনীর হামলা৻ গত কয়েক বছরে বারবার আমাদের উপরে হামলা চালিয়েছে সরকারি শান্তিরক্ষী বাহিনী, সালভা জুডুম৻”
অনূষা জানায় তাঁর পার্টিতে আসার কারণও৻
“আমার দিদির স্বামীকে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে নিরাপত্তাবাহিনী৻ আর তার পরেই আমি পার্টিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নি৻ বাড়িতে থাকতে আর সাহস পাইনি৻”
যাদের বয়স আর একটু বেশি তাঁরা বলেছেন, ধারাবাহিকভাবে বনবিভাগ বা রাজস্ব বিভাগের কর্মীরা আদিবাসী মহিলাদের উপর শারীরিক অত্যাচার করেছেন৻
“আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে মহিলারা বাড়িতে থাকতে ভয় পেতেন৻ বনবিভাগ বা রাজস্ব বিভাগের কর্মীরা হামেশাই বাড়িতে এসে হাঁস-মুরগীর সঙ্গে মহিলাদেরও নিয়ে যেতেন, সেই কারণেও অনেকেই সে সময়ে পার্টিতে যোগ দেন,” বলছিলেন নীতি, মাওবাদীদের দক্ষিণ বস্তার ডিভিশনের সদস্য৻
মাওবাদীদের ভয়ে এই সরকারি বিভাগীয় কর্মীদের গ্রামে আসা বন্ধ হয়৻ একথা জানিয়ে নীতি বলছিলেন, দক্ষিণ ছত্তিশগড়ে পার্টির জনপ্রিয় হওয়ার এটা একটা অন্যতম কারণ৻
পুলিশের মহানির্দেশকের বক্তব্য

ছত্তিশগড় রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক বিশ্বরঞ্জন মনে করেন মহিলাদের উপরে অত্যাচারের যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা ভিত্তিহীন৻
“মহিলাদের উপরে অত্যাচারের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা করছেন মাওবাদীদের সমর্থকরা৻ আদিবাসী সমাজে একধরণের নিজস্ব সাম্যতা আছে৻ মহিলাদের সেখানে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেওয়া হয়৻ মহিলাদের যদি ইচ্ছা হয় আদিবাসী সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে কোনও সর্ম্পক স্থাপন করবেন তবে তিনি তা করতে পারেন৻ আদিবাসী সমাজে প্রচুর বিবাহ-বর্হিভূত সর্ম্পক আছে৻”
আর অন্য একটি প্রশ্নের উত্তরে সালভা জুড়ুমকে একটি শান্তি আন্দোলন বলে ব্যাখ্যা করেন বিশ্বরঞ্জন৻
মহিলাদের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে মাওবাদীদের সাংস্কৃতিক শাখা, চৈতন্য নাট্যমঞ্চ-কে শক্তিশালী করার পিছনেও৻ সেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পটভূমি আগামী সপ্তাহে৻








