কায়রো আবার বিক্ষোভে উত্তাল

তাহরির চত্ত্বরের লড়াই
ছবির ক্যাপশান, ক্লান্ত বিক্ষোভকারীরা ট্যাংকের কাছেই ঘুমিয়ে পরেছেন
Published

প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবিতে কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হচ্ছেন৻

বিক্ষোভকারীরা এই দিনকে ‘বিদায়ী শুক্রবার‘ হিসেবে ঘোষণা করেছে, অর্থাত্ তারা এই দিনেই প্রেসিডেন্ট মোবারকের পদত্যাগ দেখতে চান৻

সকাল থেকেই তাহরির চত্ত্বরে সেনাবহিনীর উপস্থিতি আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে৻

প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন তানতাউয়ি অন্যান্য সামরিক অফিসারদের নিয়ে চত্ত্বর পরিদর্শন করতে যান৻

গত দুদিনে কায়রোর কেন্দ্রস্থলে সরকার-বিরোধী বিক্ষোকারী আর প্রেসিডেন্ট মোবারকের সমর্থদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং এক হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন৻

গত দুদিনে প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা তাহরির চত্ত্বর হামলা করায় বিরোধীদের মনোভাব আরো শক্ত হয়েছে৻ তারা সন্দেহ করছে হামলার পেছনে সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা সক্রিয় ছিলো৻

তাহরির চত্ত্বরে বিক্ষোভ
ছবির ক্যাপশান, শুক্রবার তাহরির চত্ত্বরে বিক্ষোভ

বিরোধীরা শুক্রবারের বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে মি মোবারকের ‘‘কফিনে শেষ পেরেক‘‘ ঢুকিয়ে দিতে চাইছে৻

অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেয়মান বিক্ষোভকারীদের অনুরোধ করেছেন তারা যেন প্রেসিডেন্ট মোবারকের নির্বাচনে না দাড়ানোর অঙ্গীকারন মেনে নেয়৻

দেশের বাইরে থেকেও চটজলদি পদত্যাগ করার জন্য মি মোবারকের উপর চাপ আসছে৻

যুক্তরাষ্ট্র এখনই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে৻

জানা গেছে যুক্তরাষ্ট্র মি সুলেয়মানের সাথে ‘‘অর্থবহ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া‘‘ নিয়ে আলোচনা করছে৻

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা বলেছে, আলোচনায় একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে মি মোবারক এখনই পদত্যাগ করবেন আর মি সুলেয়মান একটি অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান হবেন৻

মি মোবারক এক আমেরিকান টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাত্কারে বলেছেন তিনি এত বছর সরকারি চাকরি করে তিক্ত-বিরক্ত, এবং চলে যাবার জন্য প্রস্তুত৻

কিন্তু তিনি মিসরের কথা ভেবে পদত্যাগ করছেন না৻

‘আমি যদি পদত্যাগ করি তাহলে দেশে চরম বিশৃংখলার সৃষ্টি হবে‘, তিনি আমেরিকান টেলিভিশন এবিসিকে বলেন৻

মি মোবারক হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেন যে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিলে ইসলামপন্থী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড শূন্যতা পূরণ করবে৻

এর আগে বৃহস্পতিবার, মিসরের প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিক সরকার সমর্থক আর বিরোধীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন৻

কায়রোর তাহরির চত্ত্বরে রাতভর সরকার সমর্থক আর বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ আর গুলিবর্ষণে অন্তত ১৩ নিহত আর শত শত আহত হয়েছে৻

বেসরকারী টেলিভিশন আল-হায়াতকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে মি শফিক সহিংসতার ঘটনাকে ‘মারাত্বক ভুল‘ বলে বর্ণনা করে তদন্ত করার অঙ্গীকার করেন৻

‘‘তদন্তে যখন বের হবে কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে এবং কার জন্য এটা হতে পারলো, আমি কথা দিচ্ছি তাদেরকে জবাবদিহী করতে হবে এবং উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে‘‘, মি শফিক বলেন৻

‘‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের ‌উপর হামলার কোন যৌক্তিকতা নেই, এবং সেজন্য আমি ক্ষমা চাইছি‘‘, মি শফিক বলেন৻

সেনাবাহিনী ট্যাংক
ছবির ক্যাপশান, চত্ত্বরের এক প্রবেশমুখে ট্যাংক মোতয়েন

তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘ঘরে ফিরে‘ গিয়ে এই সংকট কাটাতে সাহায্য করার আহ্বান জানান৻

গভীর রাতে চত্ত্বরের আশে-পাশে থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকজন বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে প্রায় দুঘন্টা ধরে গুলিবর্ষণ করে৻

গুলিতে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত আর বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন৻ তবে সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি৻

তবে মিসরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আহমেদ সামিহ বলছেন, বুধবারের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত আর প্রায় ৯০০ জন আহত হয়েছেন৻

বৃহস্পতিবার সকালে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকলে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীরা তাদের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য ব্যারিকেড সৃষ্টি করে৻

টানা দশ দিন ধরে হাজার হাজার মানুষ প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পদত্যাগের দাবিতে তাহরির চত্ত্বরে বিক্ষোভ করছে৻

চত্ত্বরের এক প্রান্তে মিসরের বিখ্যাত যাদুঘরের কাছে অক্টেবর ৬ সেতুর উপর থেকে মোবারক সমর্থকরা গুলিবর্ষণ করছিলো বলে বিক্ষোভকারীরা মনে করেন৻

‘‘দু‘মিনিট পরপরই এক ঝাঁক গুলি করা হচ্ছিলো, এবং সেটা শুধুমাত্র যাদুঘরের কাছে ঐ একটা দিক থেকেই‘‘, বললেন চত্ত্বর থেকে বিবিসিকে বললেন আন্দোলনকারী মোনা সায়েফ৻

‘এই জায়গাতেই পাঁচ ঘন্টা ধরে অনবরত সংঘর্ষ হয়েছে‘‘, মিস সায়েফ বলেন৻

বুধবার বিক্ষোভকারীরা তাহরির চত্ত্বরে সমাবেশ করছিলো যখন মি মোবারকের হাজর হাজার সমর্থক চত্ত্বর দখল করার চেষ্টা করে৻

দুপক্ষের মধ্যে দিনভর সংঘর্ষে শত শত লোক আহত হয়, বেশির ভাগ ইট-পাথরের আঘাতে৻

চত্ত্বরে আহত কয়েকজন বিক্ষোভকারী
ছবির ক্যাপশান, চত্ত্বরে আহত কয়েকজন বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট মোবারকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে

বিক্ষোভকারীরা বলছে প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা মারামারি শুরু করে ইট-পাথর ছোঁড়ার মাধ্যমে৻

‘‘আমরা পাল্টা ইট-পাথর ছুঁড়ে তাদেরকে চত্ত্বর থেকে বের করে দেই‘‘, জাকারিয়া নামের একজন বিক্ষোভকারী বিবিসিকে বলেন৻

বিরোধীরা বলছে প্রেসিডেন্টের সমর্থকদের অনেককেই ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়েছিলো, এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের চত্ত্বরে প্রবেশ করতে দেয়৻

সরকার সমর্থকদের হামলার আগে সেনাবাহিনী এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেয়মান বিক্ষোভকারীদের তাহরির চত্ত্বর থেকে চলে যাবার আহ্বান জানিয়েছিলেন৻

মি সুলেয়মান বলেন বিরোধীরা রাজপথ থেকে উঠে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি তাদের সাথে রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে কোন আলোচনায় বসবেন না৻

মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে মি মোবারক সেপ্টেম্বর মাসের নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করার ঘোষণা দেন৻

তবে তিনি বলেন মিসরে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সেপ্টেম্বরে তাঁর মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকবেন৻

রাজধানী কায়রোর কেন্দ্রস্থলে সমবেত লক্ষ লক্ষ বিক্ষোভকারী তাঁর ভাষণ প্রত্যাখান করে৻ ‘‘যাও যাও‘‘ স্লোগানে গোটা তাহরির চত্ত্বর মুখরিত হয়ে ওঠে৻

‘আমরা এই চত্তর থেকে তখনই যাবো যখন মোবারক আমাদের দেশ থেকে চলে যাবেন‘,একজন বিক্ষোভকারী বিবিসিকে বলেন৻

মিসরের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মোহাম্মাদ আল-বরাদাই বলেন মি মোবারাকের ঘোষণা ক্ষমতায় টিকে থাকার একটি ‘কারসাজি‘ মাত্র৻

প্রেসিডেন্ট মোবারকের সমর্থকরা
ছবির ক্যাপশান, প্রেসিডেন্ট মোবারকের সমর্থকরা বুধবার রাস্তায় নামে

বিরোধী গোষ্ঠী কিফায়া (মানে, ‘যথেষ্ট‘) নেতা আব্দেলহালিম কানদিল বলেন নির্বাচনে না দাঁড়ানেরা ঘোষণা যথেষ্ট নয়৻

‘‘এখানে অভূতপূর্ব একটি গণআন্দেোলন হচ্ছে যেখানে প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে‘‘, মি কানদিল বলেন৻

অনেক বিক্ষোভকারী মি মেবারকের ভাষণকে অর্থহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন৻

তবে অন্যরা মনে করেন এখানে আপোষের সুযোগ আছে, কারণ এই পথে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সবাই জয়ী হতে পারে ৻

তারা মনে করেন হঠাৎ করে পরিবর্তন আসলে তার পরিণাম আরো ভয়াবহ হতে পারে৻

দেশের বাইরে থেকেও চাপ আসছে৻

ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, মিসরের এই ক্রান্তিকালে বিরোধীদের ভূমিকা আবশ্যক, যার মধ্য দিয়ে অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে৻

তবে তিনি বলেন এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখনি শুরু হতে হবে৻

‘‘আমার বিশ্বাস শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে অবশ্যই অর্থবহ হতে হবে, এবং এটা এখনি শুরু হতে হবে‘‘, মি ওবামা বলেন৻

মি ওবামার এই বক্তব্যে মি মোবারকের সমর্থকরা যে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন তা বুধবার বোঝা যায়৻

শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদেশী বিশেষ করে আমেরিকান সাংবাদিক আর আল-জাজিরার কর্মীরা তাদের রোষাণলের শিকার হন৻