‘অবরুদ্ধ‘ ত্রিপোলিতে সংঘর্ষ

ছবির উৎস, No credit
লিবিয়াতে কর্নেল গদ্দাফির নিয়ন্ত্রণ এখন দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ক্ষুদ্র একটি অংশেই সীমিত বলে ধারণা করা হচ্ছে৻
রাজধানী ত্রিপোলি অবশ্য ঘিরে আছে সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক, শহরের পাহারার দায়িত্বে আছে বিশেষ একটি সেনা ব্রিগেড – যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন গদ্দাফির ছেলে খামিস৻
স্থানীয় বাসিন্দারা বিবিসিকে বলছেন, ত্রিপোলিতে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি করলে অন্তত একজন নিহত হয়েছে৻
ত্রিপোলিকে তারা অবরুদ্ধ নগরী বলে বর্ণনা করছেন৻
শহরের দুই প্রান্তে, পশ্চিমদিকে আল-জাইয়া ও পূর্বদিকে মিসুরাতা – দুটো শহর থেকেই সংঘর্ষের খবর আসছে৻
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম বলছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শত শত মানুষ লিবিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছেন৻
সংস্থাটি বলছে, তাদের অনেকেই অসুস্থ বা আহত অবস্থায় পার্শ্ববর্তী দেশ নিজেরে পৌছেছে৻
আফ্রিকা থেকে ভাড়াটে সৈন্যরা লিবিয় সরকারের পক্ষে কাজ করছে বলে অভিযোগের প্রেক্ষিতে আফ্রিকানদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বিদ্রোহীরা৻
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ত্রিপোলির একজন বাসিন্দা বিবিসিকে বলছিলেন শহরে মানুষ ঘরে বন্দী, কোনও সন্দেহ নেই শহর একদম অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে৻
মানুষ ভয় পাচ্ছে, আর আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ফোনে ফোনে৻
তিনি আরও জানান, এমন কী নিহতদের পরিবার তাদের প্রিয়জনদের দেহ পর্যন্ত আনতে যেতে পারছে না৻

ছবির উৎস, Other
দেহ নিতে গেলে এই হলফনামায় সই করে আসতে হচ্ছে যে বিরোধীদের গুলিতেই তার মৃত্যু হয়েছে৻ ফলে কোনও জানাজাও হতে পারছে না৻
তবে রাজধানী থেকে কর্নেল গদ্দাফির নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে হলে সম্ভবত সেনাবাহিনীর আরও কিছু ইউনিটকে বিরোধীদের দিকে ঝুঁকতে হবে, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্যটা হেলে যায়৻
বেনগাজি শহর অবশ্য পুরোপুরি বিরোধীদের দখলে, শহরটা চালাচ্ছে একগুচ্ছ কমিটি৻ শহরে পোস্টার সেঁটে মানুষকে কাজে ফিরতেও আহ্বান জানানো হচ্ছে ৻
কর্নেল গদ্দাফির অনুগত বাহিনীকে বেনগাজি থেকে তাড়ানোর তিক্ত লড়াইয়ের পর বিরোধীরা এখন এটা দেখাতে চাইছেন যে বিগত সরকারের চেয়ে তারা অনেক ভালভাবে প্রশাসন সামলানোর ক্ষমতা রাখেন৻
অন্যদিকে মানুষের আনুগত্য ফেরাতে কর্নেল গদ্দাফির সরকার এখন সরাসরি দেশবাসীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে৻
জাতীয় টেলিভিশনে এই নগদ অর্থপ্রদানের কথা ঘোষণা করে জানানো হয়, জিনিসপত্রের দাম সম্প্রতি যেভাবে বেড়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতে জেনারেল পিপলস কংগ্রেস প্রত্যেক পরিবারকে মাসে ৫০০ দিনার করে অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৻
আরও বলা হয় এটা চলবে দুমাস ধরে – ফলে প্রতিটি পরিবার পাবে ১০০০ দিনার বা আটশো মার্কিন ডলার করে৻
সরকারি কর্মচারীদেরও বেতন বাড়বে প্রায় দেড়শো শতাংশ, আর ন্যূনতম পারিশ্রমিকের হার করা হবে প্রায় দ্বিগুণ৻
তবে সরকারের তরফে এই পারিতোষিকের ঘোষণার পরও রাজধানী অভিমুখে বিরোধীদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে বলেই লিবিয়া থেকে সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন৻
এদিকে লিবিয়ার সঙ্কটে আন্তর্জাতিক বিশ্ব কীভাবে একটি সুসমন্বিত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, সেই প্রচেষ্টাও ক্রমশ গতি পাচ্ছে৻
এ ব্যাপারে আলোচনা করতে প্রেসিডেন্ট ওবামা এরই মধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইটালির নেতাদের সাথে কথা বলেছেন৻
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মি ওবামা অনেকগুলো সম্ভাব্য পদক্ষেপের রূপরেখা নিয়ে কথা বলেছেন – যার মধ্যে মানবিক সহায়তা পাঠানোর মতো বিষয়ও আছে৻

ছবির উৎস, Getty
লিবিয়া পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে ব্রাসেলসে এদিন বিকেলে নেটোর রাষ্ট্রদূতরাও এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন৻
এই বৈঠক কেন ডাকা হয়েছে, তার কারণ ব্যাখ্যা করে নেটোর মহাসচিব অ্যান্ডার্স ফ রাসমুসেন বলেন, লিবিয়াতে যা ঘটছে তা সকলের জন্য বিরাট উদ্বেগের বিষয়৻
তিনি আরও বলেন, এই সঙ্কট ঘটছে আমাদের ঘরের দোরগোড়াতেই, লিবিয়ার বেসামরিক মানুষ এবং সেই সঙ্গে নেটোর সদস্য দেশগুলোর হাজার হাজার নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব পড়ছে৻
এছাড়া লিবিয়ার সঙ্গে অস্ত্র বেচাকেনায় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ফরাসি ও ব্রিটিশ সরকার যৌথভাবে একটি প্রস্তাব এনেছে – যা নিয়ে দিনের আরও পরের দিকে আলোচনা হওয়ার কথা৻
হোয়াইট হাউসও ইঙ্গিত দিয়েছে লিবিয়ার প্রশ্নে সব রাস্তাই খোলা – যার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার মতো বিষয়ও আছে৻
ফরাসি সরকার বেশ কিছুদিন ধরেই লিবিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে আসছে – এখন তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে কর্নেল গদ্দাফির বিচারেরও দাবি তুলছে৻
কর্নেল গদ্দাফির বৃহস্পতিবারের ভাষণ
লিবিয়ায় গণঅভ্যুত্থানের জেরে দেশের বিস্তীর্ণ অংশের ওপর থেকে কর্নেল গাদ্দাফি যখন নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন, তখন তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে আবারও ভাষণ দিয়েছেন৻
তবে এই ভাষণে তাঁর ছবি দেখা যায়নি, শোনা গেছে শুধু কন্ঠস্বর – যেখানে তিনি লিবিয়ার সহিংসতার জন্য আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করেছেন৻
লিবিয়াতে যা ঘটছে তাকে তিনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলেও বর্ণনা করেছেন৻

ছবির উৎস, Reuters (audio)
লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে টেলিফোনের মাধ্যমে দেওয়া বিশ মিনিটের এই ভাষণে লিবিয়ার সহিংসতার জন্য আল কায়িদার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে তিনি বলেছেন লিবিয়ায় বিক্ষোভ ও সহিংসতার জন্য আল কায়দাই দায়ী৻
‘এটা পরিস্কার হয়ে গেছে যে আমাদের ছেলেদের এই কাজে নিয়োগ করেছে আল কায়দা- বিন লাদেন, যাঁর পরিচয় একজন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসাবে৻ আমেরিকা, ইউরোপ এবং সারা বিশ্ব তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে৻`
তিনি বলেন, বিন লাদেন ও তাঁর অনুসারীদের জন্য কোন ক্ষমা নেই৻ লিবিয়ার অসন্তোষের জন্য যারা দায়ী, তাদের এখন আটক করা উচিত, এবং তাদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালানো উচিত৻
জনগণের উদ্দেশ্যে কর্নেল গাদ্দাফি বলেন তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে যেন তারা সমর্থন না করেন৻ আল কায়দা অনুসারীদের বিরুদ্ধে তিনি আরো অভিযোগ ছুঁড়ে দেন এই বলে যে তারা বিদ্রোহীদের অবৈধ মাদক ও মদ্যপানীয় সরবরাহ করছে৻ অজ্ঞাত এসব ব্যক্তিদের দোষারোপ করে তিনি লিবীয় পরিবারগুলোর উদ্দেশ্যে বলেন তাদের সন্তানদের এদের কাছ দূরে রাখতে এবং তাদের ঘরে ফিরিয়ে আনতে৻
‘১৬/১৭ বছরের ছেলেরা বিভ্রমসৃষ্টিকারী মাদক নিচ্ছে৻ ঘরে ফিরে এলে এবং মাদক সেবন ছেড়ে দিলেই তারা বুঝতে পারবে তারা যা করেছে তার ব্যাপকতা কতখানি এবং এতে তারা দেশের কতটা ক্ষতি করেছে৻ যারা ইতিমধ্যে কথা বলেছে তারা অনুশোচনা করেছে, গ্লানি প্রকাশ করেছে৻`
কর্নেল গাদ্দাফি তাঁর ভাষণে বলেন সম্মানিত ব্যক্তিরা নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয় না৻
রাজধানী ত্রিপলির ৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে যাওইয়া শহর থেকে লড়াইয়ের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে ভাষণে তিনি বারবার তার কথা উল্লেখ করেছেন৻
সেখানে সরকারি সৈন্য ও সশস্ত্র মিলিশিয়াদের ব্যাপক উপস্থিতিতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে৻ সেখানে বিদ্রোহীদের ওপর বিমানবিধ্বংসী কামান ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে গোলাগুলির খবর দিচ্ছে প্রত্যক্ষদর্শীরা৻
কর্নেল গাদ্দাফি বলেছেন এ খবরে তিনি দুঃখিত৻ সেখানে শক্তিপ্রয়োগ বন্ধ হওয়া উচিত বলে তিনি তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন৻








