বাংলাদেশে ফিরল পাচার হওয়া নারীরা

trafficking
ছবির ক্যাপশান, নারী পাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পাচার-বিরোধী দিবসে প্রতিবাদ (ফাইল ছবি)
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভারতে পাচার হয়ে যাওয়া ৪৮জন নারী ও একটি শিশুকে দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে ভারত।

বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় পুলিশের কাছ থেকে তাদের গ্রহণ করে। তাদেরকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

এদের মধ্যে অনেকেই বেশ কয়েক বছর ভারতের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে কাটিয়েছেন।

উদ্ধার হওয়া নারীদের মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে ফিরে গেছেন তাদের পরিবারের কাছে। আর বাকিরা ফিরে যাবার অপেক্ষায় বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছেন।

তাদের বেশিরভাগের গল্পই অনেকটা একই রকম। একটু ভাল জীবনের আশায় চাকরির খোঁজে নেমে পাচারকারীদের কবলে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন অনেকেই।

তাদেরই একজন বললেন স্বামী পরিত্যক্তা হবার পর ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর কাছে চাকরির কথা বলেই ভুল করেছেন তিনি। ‘বান্ধবীকে কষ্টের কথা বললে সে আমাকে মুম্বাই চাকুরী দেবে বলে জানায় । অত দূর আমি যেতে চাইনি।’

‘এর পর সে আমাকে তার বাসায় বেড়াতে যেতে বলে না জানিয়ে কখন যে সীমান্ত পার করে নিয়ে গেল বুঝতে পারিনি। আমাকে সে খুন করার ভয়ও দেখিয়েছে”, বললেন তিনি।

মুম্বই যাবার পথে রাস্তায় পুলিশের কয়েকজনের দেখা মিললে হঠাৎ করেই দৌড়ে পালিয়ে যান উদ্ধার হওয়া এই নারী। এর পর ভারতের জেল ও তারপর আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে তিনি দেড় বছর কাটিয়েছেন।

আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার সময় জীবন সম্পর্কে আশা হারিয়ে ফেলতেন অনেকেই।

এক কন্যা সন্তানের জননী যশোরের এক নারী বলছিলেন, “দেশের জন্য খুবই খারাপ লাগতো। কীভাবে বাড়ি যাব, কে নিয়ে যাবে এসব ভেবে মন খুব অস্থির হয়ে উঠত। মাঝে মাঝে মনে হতো দেশে আর বোধহয় ফেরাই হবে না”

আশ্রয়কেন্দ্রে অপেক্ষমান খুলনার এক কিশোরী বললেন মোবাইল ফোনে এক যুবকের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠার খেসারত হিসেবে তাকে ভারতের জেল ও আশ্রয়কেন্দ্র দুটোই দেখতে হল।

তাকে ঢাকায় চাকরি দেবার নাম করে পাচার করে দেয় সেই যুবক, তবে মুম্বইয়ে ট্রেন থেকে নামার সাথে সাথেই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন তিনি। তার পরের গল্পও প্রায় একই রকম।

বাংলাদেশের দুটি মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর এবং বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে এই নারীরা বাংলাদেশ ফেরত এসেছেন।

রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলছিলেন উদ্ধারকৃত নারীদের মধ্যে কেউ কেউ ৫ থেকে ৬ বছরের মতো কাটিয়েছেন ভারতের জেল এবং আশ্রয়কেন্দ্রে।

mumbaiskylin
ছবির ক্যাপশান, এই মুম্বইতে চাকরির লোভ দেখিয়েই পাচার করা হয় বাংলাদেশের বহু নারীকে

তাদের অনেকেই ভারতের পতিতালয় থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন, কেউ আবার নিজেই পালিয়ে গিয়ে পুলিশের কাছে ধরা দিয়েছেন।

মি মল্লিক বলছিলেন, ‘ভারত এবং বাংলাদেশে দুপক্ষেরই আমলান্ত্রিক জটিলতার কারণেই উদ্ধারকৃত নারীদের দেশে প্রত্যাবর্তনে দীর্ঘসূত্রিতার মুল কারণ।’

তাঁর কথায়, ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র নিয়ে যেতে হয়। তবে নারীদের পরিচয় ঠিকানা সনাক্ত করতে পুলিশ সবচেয়ে বেশি সময় নেয় যা দেরির অন্যতম কারণ।’

বাংলাদেশে সম্প্রতি মানব পাচার রোধে শক্ত একটি আইন প্রণয়ন হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ নামের এই আইনে মানব পাচারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

তবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর মানব পাচারের মোট হিসেব সম্পর্কে নানাধরনের গরমিল রয়েছে।

মানব পাচার নিয়ে কাজ করে এরকম সংগঠনগুলি বলছে সামাজিক চাপের কথা ভেবে পাচারের বিষয়টি পুলিশের কাছে চেপে যান অনেকে আর তাই আসল সংখ্যা প্রায়ই অজানা থাকে।

দেশের সীমান্তবর্তী জেলা গুলো থেকেই নারী পাচারের ঘটনা বেশি ঘটে বলে জানা যায়।