উদ্ধার ব্যাহত উত্তরাখন্ডে, মৃতদের গণঅন্ত্যেষ্টি

- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
- Published
ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যে নতুন করে মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টির ফলে আজ প্রায় অর্ধেক দিন উদ্ধারকাজে কোনও বিমানই উড়তে পারেনি। তবে দুপুরের পর থেকে আবহাওয়ার উন্নতি হওয়ায় বদ্রীনাথ সহ দূরের পাহাড়ি এলাকাগুলোয় হেলিকপ্টার যেতে শুরু করেছে।
কেদারনাথ এলাকায় ১২৭ টি মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে – যার ফলে খুঁজে পাওয়া মৃতদেহের সংখ্যা আটশো ছাড়িয়ে গেছে। যদিও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আজ আবারও বলেছেন যে মৃতের সংখ্যা হাজারের বেশী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কেদারনাথে মৃতদেহগুলির আজ গণ-শবদাহ করার ব্যবস্থা করেছে সরকার। এদিকে ওই মন্দির থেকে ও হতাহতদের কাছ থেকে লুঠ করা এক কোটি টাকারও বেশি নগদ অর্থ ও প্রচুর গয়নাগাঁটি সহ ধরা পড়েছেন বেশ কয়েকজন সাধুসন্ত।
আজ সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টির ফলে উত্তরাখন্ডের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে ধস নেমেছে – ভেঙ্গে গেছে রাস্তা। অন্তত তিনজনকে ধসের ফলে নদীতে তলিয়ে যেতে দেখেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
হিন্দুদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র বদ্রীনাথে প্রায় ৫ হাজার মানুষ এখনও আটকে আছেন। আজ থেকে তাঁদের হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করার কাজ শুরু হয়েছে।
যাঁরা চলতে সক্ষম – এমন পর্যটকদের প্রায় ৫৮ কিলোমিটার পায়ে হাঁটিয়ে নামিয়ে আনছেন সেনা সদসস্যরা। আরও ৪০০ কিলোমিটার দূরের হরশিলে আটকে পড়েছেন এক হাজারেরও বেশী পর্যটক।
দুর্গম ভৈরোঁ ছটি আর গারুদ ছটি এলাকায় আটকে পড়া কিছু মানুষকে উদ্ধারের জন্য বায়ুসেনার গারুদ প্যারাট্রুপারদের পাঠানো হয়েছে - কোমড়ে দড়ি বেঁধে পর্যটকদের বিমানে তুলে আনছেন তাঁরা।

অন্য দিকে রুদ্রপ্রয়াগে নৌবাহিনীর মার্কোস কম্যান্ডো ও ডুবুরি পাঠানো হয়েছে উদ্ধারকাজের জন্য। আজ কেদারনাথ এলাকা থেকেই কাদা-মাটি আর পাথর সরিয়ে ১২৭ টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সরকারিভাবে এ নিয়ে মোট ৮০৭টি মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় বহুগুনা অবশ্য এদিনও বলছিলেন আসলে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে।
তাঁর কথায়, ‘আগেই জানানো হয়েছে, যতগুলি মৃতদেহ পাওয়া গেছে – প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও অনেক বেশী – হাজার খানেকও ছাড়িয়ে যাবে বলেই প্রশাসনের আশঙ্কা৻’
মি বহুগুনা আরও বলেন, ‘যতদিন না জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা সেনা-সদস্যরা, যাঁরা পায়ে হেঁটে দুর্গম এলাকাগুলি থেকে ফিরে আসছেন, যতক্ষণ কাদামাটি ও পাথর না-সরানো যাচ্ছে – বা নদীগুলিতে বয়ে যাওয়া মৃতদেহগুলি ভেসে না উঠছে, ততদিন অবধি প্রকৃত সংখ্যাটা বলা কঠিন।’
কেদারনাথ এলাকায় আর কারও জীবিত থাকার সম্ভাবনা না থাকার পরে আজ কয়েকশো মৃতদেহের গণ-সৎকার করা হচ্ছে সেখানে।
সেনাবাহিনীর বিশালাকার একটি হেলিকপ্টারে করে প্রায় দেড়শো কুইন্টাল কাঠ আর দেশি ঘি পাঠানো হয়েছে মৃতদেহগুলি সৎকারের জন্য।
শবদাহের আগে প্রতিটি মৃতদেহের ছবি ও ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্য দিকে, কেদারনাথ মন্দির ও মৃত এবং আহতদের গয়না আর নগদ লুঠ করে পালাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ধরা পড়েছেন – যাঁদের মধ্যে কয়েকজন সাধুসন্তও আছেন৻
ভারত তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আইটিবিপি-র মহানির্দেশক অজয় চাড্ডা জানান, কয়েকজন ব্যক্তি বিরাট বড় বড় ব্যাগ নিয়ে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলোতে চড়তে গিয়েছিলেন। বেশি মালপত্র নেওয়া যাবে না বলা সত্ত্বেও তাঁরা ব্যাগগুলি কাছছাড়া করতে রাজি হননি।
তাঁরা উদ্ধারকর্মীদের বলেন ব্যাগগুলি নিয়ে বিমানে চড়তে না দিলে তাঁরা বরং কেদারনাথেই থেকে গিয়ে ঈশ্বরের সেবা করবেন।
সন্দেহ হওয়ায় উদ্ধারকর্মী ও সীমা পুলিশ ব্যাগ তল্লাশি করে, তখনই এক কোটি ১৪ লাখ টাকা আর প্রচুর গয়না পাওয়া যায়৻ এগুলো সবই লুঠ করা।
মৃতদেহগুলি থেকেও গয়না আর নগদ অর্থ কেড়ে নিয়েছে ওই দুষ্কৃতীরা, জানান আইটিবিপি-র মহানির্দেশক অজয় চাড্ডা।
এদিকে রাজধানী দেরাদুনের সহস্রধারা হেলিপ্যাড আর জলি গ্রান্ট বিমানবন্দরে পাহাড় থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা পর্যটকদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে নিখোঁজদের আত্মীয়স্বজনের সংখ্যাও।
এছাড়া আসছে প্রচুর ত্রাণসামগ্রীও। অনেক সাধারণ মানুষও স্বেচ্ছায় নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে বা উদ্ধার কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছেন।

এক স্থানীয় তরুণী চিকিৎসক রিচা জলি গ্রান্ট বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন আহতদের সেবা করতে দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনী তাঁকে নিয়ে যেতে পারে কী না, সেই খোঁজ করতে।
তিনি বিবিসি-কে বলছিলেন, যে সব এলাকা সব চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তিনি সেখানেই যেতে চান৻ জায়গাগুলো যে বিপজ্জনক হয়ে আছে, সেটা জেনে বুঝেই তিনি এগিয়ে এসেছেন।
‘স্থানীয় মানুষ হওয়ায় আমি এলাকাগুলো চিনি৻ তবে কার সঙ্গে দেখা করলে যে সেনাবাহিনী আমাকে দুর্গম এলাকায় নিয়ে যাবে – সেটাই স্পষ্ট নয়। অনেকের সঙ্গেই দেখা করলাম, কিন্তু এখনও কোনও লাভ হয়নি’, বলছিলেন ডাক্তার রিচা।
ওদিকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে জমা দেওয়া এক রিপোর্টে উত্তরাখন্ড সরকার বলছে যে আগামী দুতিন দিনের মধ্যেই হয়ত সবাইকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
আদালত ত্রাণ আর উদ্ধার কাজে আরও গতি আনতে আজ আবারও নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় আর রাজ্য সরকার, উভয়কেই।








