লোকসভায় পাস হয়েছে লোকপাল বিল
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
- Published
ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় আজ পাস হয়েছে সে দেশের বহুপ্রতীক্ষিত লোকপাল বিল – যার মধ্যে দিয়ে সে দেশে দুর্নীতি-বিরোধী একজন স্বাধীন অমবাডসম্যান বা লোকপাল নিয়োগের পথ প্রশস্ত হল।
কাল রাজ্যসভার পর আজ লোকসভাতেও প্রায় অনায়াসে ধ্বনিভোটে পাস হয়ে যায় এই বিল – এখন রাষ্ট্রপতি সই করলেই এটি দেশের আইনে পরিণত হবে।
কংগ্রেস ও বিজেপি-সহ দেশের প্রায় সব দলই সংসদে এই বিলটি সমর্থন করেছে – বিলটি সমর্থন পেয়েছে দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনের নেতা আন্না হাজারেরও।
যদিও ভারতে দুর্নীতি দমনে বিলটি আদৌ কোনও কাজে আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান দুর্নীতি-বিরোধী রাজনৈতিক দল আম আদমি পার্টি। :
ভারতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লোকপাল নিয়োগের দাবি অন্তত ৪৬ বছরের পুরনো – এবং সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই তা যেভাবে পাস হয়ে গেল, তা প্রায় নজিরবিহীন।
লোকসভায় এই বিল নিয়ে বিতর্কের জন্য চার ঘন্টা নির্ধারিত থাকলেও মাত্র এক ঘন্টারও কমে আজ সব চুকেবুকে যায় – বিলের বিরোধিতা করে শুধু সমাজবাদী পার্টি ওয়াকআউট করে।
যে বিল নিয়ে এত বছর বিন্দুমাত্র অগ্রগতি হয়নি, কংগ্রেস ভাইস-প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজ – সবাই আজ রীতিমতো তড়িঘড়ি করে সেই বিলই পাস করোনোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
লোকসভায় বিলটি অনুমোদিত হওয়ার পর আইনমন্ত্রী কপিল সিব্বাল বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে মিলে দেশবাসীকে ও দেশের সুশীল সমাজকে এই বার্তাই দিতে চাইছি, আপনাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো আমরা শুনছি, ব্যবস্থা নিচ্ছি। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ধন্যবাদ – এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই লড়াইতে আমরা আপনাদের সঙ্গেই আছি।’
কপিল সিব্বাল যে দৃষ্টি আকর্ষণের কথা বলছেন, তার সূত্রপাত আসলে প্রায় আড়াই বছর আগে – লোকপাল গঠনের দাবিতে সমাজসেবী আন্না হাজারের অনশন তখন সারা দেশে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল।
সংসদের চলতি অধিবেশনেই যাতে এই বিলটি পাস করানো হয়, তার দাবিতে নদিন আগে থেকে মহারাষ্ট্রে নিজের গ্রাম রালেগান সিদ্ধিতে এবারেও অনশনে বসেছিলেন আন্না হাজারে – আর বিলটি পাস হওয়ার খবর সেখানে পৌঁছতেই আনন্দোল্লাসের বন্যা বয়ে যায়।
উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে আন্না হাজারে সেখানে বলেন, সমাজবাদী পার্টি ছাড়া সব দলের এমপি-কেই তিনি অভিনন্দন জানাচ্ছেন – কারণ তাদের জন্যই এই অসাধারণ ঘটনা ঘটানো সম্ভব হয়েছে।
কিরণ বেদীর মতো আন্না হাজারের সমর্থকরাও জানান, লোকপাল বিল সব দুর্নীতির সমাধান এ কথা তারাও বলছেন না, কিন্তু লড়াইয়ের শুরু হিসেবে এটা দারুণ।
সমস্যা হল, আন্না হাজারের একদা ভাবশিষ্য অরবিন্দ কেজরিওয়াল – যিনি নিজের রাজনৈতিক দল আম আদমি পার্টি প্রতিষ্ঠা করে দিল্লিতে হইচই ফেলে দিয়েছেন – তিনি কিন্তু মনে করছেন এই বিল একটা তামাশা – লোকপাল নয়, বরং জোকপাল বিল – এবং একটা ইঁদুরকেও এটা ধরতে পারবে না!
নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, বিলটিতে ঘাটতি নেই তা নয়, কিন্তু এতে অনেক ভাল দিকও আছে। এনজিও মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠনের নেতা নিখিল দে যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সার্বিক লড়াইয়ে লোকপালের একটা কর্তৃত্ব থাকবেই, তাদের একটা প্রসিকিউশন উইং বা মামলা করার জন্যও আলাদা শাখা থাকবে।
তা ছাড়া মন্ত্রী, এমপি বা সরকারি গ্রুপ-এ অফিসাররা সবাই এর আওতায় আসবেন। এমন কী, ছাড় পাবেন না প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীরাও।
কিন্তু সরকারের সামনে হইসলব্লোয়ার প্রোটেকশন অ্যাক্ট, কমপ্লন্ট রিড্রেসাল অ্যাক্ট ইত্যাদি আরও নানা দুর্নীতি-বিরোধী যে সব আইন আছে সেগুলো পাস না-হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই পূর্ণতা পাবে না, লড়াইয়ের সবগুলো হাতিয়ার হাতে আসবে না বলেই মি দে-র অভিমত।
আজ পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, লোকপালে চেয়ারপার্সন ছাড়াও থাকবেন আটজন সদস্য। পর্যবেক্ষকরা আরও মনে করছেন, প্রতিটি রাজ্যেই সম্ভবত এই বিলের আলাদা আলাদা সংস্করণ পাস করাতে হবে – যেটা এই বিলের আরও একটা বড় ঘাটতি।
কিন্তু সব মিলিয়ে একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিককে রোজকার জীবনে যেমন পদে পদে দুর্নীতির মুখোমুখি হতে হয়, তাতে এই নতুন বিল অবশ্যই তার কাজে আসবে – যেমনটা রাজ্যসভায় বলেছেন বিজেপির নেতা অরুণ জেটলি।
মি জেটলি তার বক্তৃতায় আরও বলছিলেন, এই লোকপাল নিয়ে দেশজোড়া বিতের্ক পার্লামেন্টারিয়ানদের সম্পর্কে যে সব কথা বলা হয়েছে, সেটা খুব সুখকর নয়। কিন্তু সেই এমপি-রাই যে শেষ পর্যন্ত এই বিল আনলেন ও পাস করালেন – সেটাই ভারতীয় গণতন্ত্রের পরিণতির প্রমাণ।
শুধু একমত নন সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়ম সিং যাদব – যিনি বলছেন ভারতের জন্য আজ এক বিপজ্জনক দিন – কারণ এই লোকপাল বিল দেশের উন্নয়নকে থমকে দেবে, এমন কী থানার একজন দারোগাও জেরা করতে পারবেন দেশের একজন প্রধানমন্ত্রীকে – যার চেয়ে অপমানজনক কিছু হতেই পারে না!








