টেস্ট ক্রিকেটের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ক্রিকেট ভক্তরা

    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসির প্রথম সারির তিনটি সদস্য দেশ ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড এই সংস্থার পুনর্গঠনের প্রশ্নে সম্প্রতি যে খসড়া প্রস্তাব দিয়েছে তা নিয়ে ক্রিকেট দুনিয়ায় বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয়েছে।

এই খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী টেস্ট র‍্যাংকিংয়ে ৯ ও ১০ নম্বরে থাকা দুটি দেশ টেস্ট ম্যাচ খেলতে পারবেনা।

সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়ের টেস্ট খেলা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আজ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এক বৈঠকে আইসিসির এই খসড়া প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে।

তবে বোর্ড জানিয়েছে, চলতি মাসের ২৮-২৯ তারিখে দুবাইয়ে আইসিসির যে সভা রয়েছে, সেখানেই সহযোগী দেশগুলোর সাথে আলোচনার পর বাংলাদেশ এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

কিন্তু এই প্রস্তাবকে কীভাবে দেখছেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা?

মিরপুরে বিসিবির সভা যখন চলছিল, সাংবাদিকদের পাশাপাশি স্টেডিয়ামের ভেতরে ও বাইরে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটভক্ত এসে ভিড় জমিয়েছিলেন, জানার আশায়, আইসিসির টেস্ট ক্রিকেটের নতুন সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কী ভাবছে?

এদের কয়েকজন বলছিলেন, তারা চান বাংলাদেশের টেস্ট খেলার মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকুক, কারণ দক্ষতার যেটুকু ঘাটতি রয়েছে, নিয়মিত খেলার মাধ্যমেই সেটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

রাজন হোসেন নামের একজন ক্রিকেট ভক্ত বলছেন, "বাংলাদেশ যদি টেস্ট খেলতে না পারে, সেটা খুবই কষ্টের হবে। কারণ আমি নিয়মিতই টেস্ট খেলা দেখি"।

তানিয়া নামের একজন ছাত্রী বলছেন, "ক্রিকেট এখন দেশের একটি জাতীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমিও প্রায়ই খেলা দেখি। এই মর্যাদা যদি চলে যায়, সেটি আমার জন্যে একটি খারাপ লাগার ব্যাপার হবে। আমরা চাই না, এধরণের কোন প্রস্তাব গ্রহণ করা বা বাস্তবায়ন করা হোক"।

স্টেডিয়ামের ঠিক বাইরে বাংলাদেশের সবুজ জার্সি গায়ে দাঁড়িয়েছিলেন একজন তরুণ। স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রতিটি গাড়ির দিকে লক্ষ্য রাখছিলেন, যদি কোন খেলোয়াড়কে দেখা যায়।

রিফাত নামের এই তরুণ আইসিসি'র নতুন সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়টি বিস্তারিতভাবেই জানেন।

তিনি বলছেন, "বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেট যত ভালোবাসে, তাতে তাদের যদি টেস্ট খেলার সুযোগই না থাকে, সেটি হবে এই দেশের সবার জন্যে একটি দু:খের বিষয়।

হয়তো বাংলাদেশের খেলার মান কিছুটা খারাপ হতে পারে, কিন্তু তারা যদি খেলতেই না পারে, সুযোগই যদি না পায়, তাহলে তাদের খেলার মান উন্নতি হবে কিভাবে?"

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের সাথে যোগাযোগ করলেও, তারা এই বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তারাও তাকিয়ে রয়েছেন বোর্ডের সিদ্ধান্তের দিকে।

ঢাকার একটি দৈনিকের ক্রীড়া সাংবাদিক মাসুদ পারভেজ বলছেন, যখন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আরো বেশি সহযোগিতা দরকার, তখনই এমন একটি প্রস্তাব তোলা হলো; যা এই দেশের ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট ভক্ত, সবার জন্যেই হতাশা এবং আশংকার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

মাসুদ পারভেজ বলছেন, "নতুন এই সংস্কার প্রস্তাব কার্যকর হলে অন্যান্য দেশগুলো তো বটেই, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়ের মতো দেশগুলো।এই প্রস্তাবটি কার্যকর হলে, র‍্যাংকিং এর নয় এবং দশ নম্বর দেশগুলোকে খেলতে হবে আইসিসির সহযোগী দেশগুলোর সাথে, যারা কিন্তু টেস্ট প্লেয়িং দেশ নয়"।

মিঃ পারভেজ আরো বলছেন, এগুলো পার হয়ে আবার র‍্যাংকিংয়ের নীচে থাকা দেশের সাথে দুটি করে টেস্ট খেলে আবার টেস্ট খেলায় ফিরতে হবে।

সব মিলিয়ে চার-পাঁচ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপার। ফলে টেস্ট প্লেয়িং দেশ হয়েও একপ্রকার টেস্টের বাইরেও চলে যাবে বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়ে, এমনটা মনে করছেন তিনি।

তবে টানা চারঘন্টার সভা শেষেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এ বিষয়ে পরিস্কার কোন বক্তব্য দেয়নি।

বোর্ড বলছে, এ মাসের শেষের দিকে দুবাইতে আইসিসি'র নির্বাহী কমিটির যে সভা হবে, সেখানেই, সহযোগী দেশগুলোর সাথে আলোচনার পর তারা সিদ্ধান্ত নেবে।

কিন্তু বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের উপর এরকম একটি হুমকি আসার পরেও কেন বোর্ড নিজেদের অবস্থান পরিস্কার করছে না?

সাবেক ক্রিকেটার এবং বিশ্লেষক রকিবুল হাসান বলছেন বলছেন, নতুন সংস্কার প্রস্তাবের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা দাঁড়িয়েছে অনেকটা শাঁখের করাতের মতো।

তিনি বলছেন, "বাংলাদেশের জন্য এটি এখন একটি উভয় সংকটের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ব্যাপারে কিন্তু ভারত সবসময়েই সমর্থন দিয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি বাংলাদেশে অস্থিরতার সময়, এসিসি বা আইসিসি প্রশ্নে ভারত কিন্তু পাশে দাঁড়িয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে। একদিকে ভারত এবং অন্যান্য বড় দেশ যারা বেশি রেভিনিউ আয় করে, তাকে কি অখুশি করবে নাকি বাংলাদেশ তার নিজের ক্রিকেট স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেবে?"

এ মাসের আটাশ ও ঊনত্রিশ তারিখে দুবাইয়ে ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যত ক্রিকেটের চেহারা।

মিঃ হাসান বলছেন, গোপন ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হলে হয়তো বাংলাদেশ তার মতামত সহজেই জানাতে পারবে।

ক্রিকেট বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো জানিয়েছে, এরই মধ্যে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ওয়েস্টইন্ডিজ।