মেঘনার তীরে স্বজনহারা মানুষদের আহাজারি

বাংলাদেশের নদীপথে লঞ্চডুবিতে এর আগেও শত শত যাত্রী মারা গেছেন
ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশের নদীপথে লঞ্চডুবিতে এর আগেও শত শত যাত্রী মারা গেছেন
    • Author, মীর সাব্বির
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

দৌলতপুরে মেঘনার পাড়ে এখন দৃশ্যটি লঞ্চডুবির পর পরিচিত দৃশ্য । পাড়ে নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারি আর লাশের জন্য অপেক্ষা।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানার দৌলতপুরে মেঘনার পাড়ে এই স্বজনদের অনেকেই অপেক্ষা করছেন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে। প্রতিটি লাশ উদ্ধার করে পাড়ে আনার সাথে সাথেই দৌড়ে আসছেন লাশটি তার স্বজনের কিনা দেখার জন্য।

এভাবেই প্রায় ১৮ ঘন্টা অপেক্ষার পর ছেলের লাশ পেয়েছেন চাঁদপুরের মোহাম্মদ ইয়াসিন। তার ছেলে মন্টু ছিল ডুবে যাওয়া লঞ্চেরই কর্মচারী। নিহত মন্টুর বোনেরা লাশের পাশে বসে আহাজারি করছিলেন।

তবে অনেকের জন্য অপেক্ষা আরো দীর্ঘ হচ্ছিল। দুপুরের তপ্ত রোদে নিজের স্বজনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ঢাকার তানভীর মেহেদি। তার বোনের স্বামী লঞ্চ ছাড়ার সময় জানিয়েছিলেন আর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই শরীয়তপুর পৌছে যাবেন। কিন্তু এরপর তার আর কোন খোঁজ মেলেনি।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় ঢাকার সদরঘাট থেকে শরীয়তপুরের সুরেশ্বরের উদ্দ্যেশে ছেড়ে যায় এমভি মিরাজ-৪ নামের লঞ্চটি। বিকেল ৩ টার দিকে মুন্সিগঞ্জের দৌলতপুরের কাছেই ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায় লঞ্চটি।

লঞ্চটি থেকে মাত্র ৪০ জনের মতো যাত্রী বেঁচে তীরে ফিরতে পেরেছেন, যেখানে কর্তৃপক্ষের হিসবে লঞ্চটিতে ছিল প্রায় ২০০ যাত্রী।

তবে প্রত্যক্ষদর্শী এবং বেঁচে ফিরে আসা যাত্রীরা বলছেন লঞ্চটিতে যাত্রীসংখ্যা ছিল ৩০০-র বেশী।

শরীয়তপুরগামী যাত্রী মোহাম্মদ আলী সেই স্বল্পসংখ্যক যাত্রীদের একজন, যারা তীরে ফিরতে পেরেছেন। তবে নিখোঁজ রয়েছেন তার স্ত্রী এবং সন্তান।

মি. আলী অভিযোগ করছিলেন, ঝড় স্বত্ত্বেও চালক লঞ্চটি তীরে না ভিড়িয়ে চালানোর চেষ্টা করায় এই দূর্ঘটনা ঘটে।

“আমাদের আগের দু’টি লঞ্চ ঝড় দেখে খালে আশ্রয় নিয়েছিল। আমরাও লঞ্চের কেরানীকে (চালক) বলেছি লঞ্চটি পাড়ে রাখতে। তবে সে আমাদের কথা না শুনে মনমতো টানলো। এরপর জোরে বাতাসের তিনটি ধাক্কায় লঞ্চটা উল্টে ডুবে গেল।” বলেন মোহাম্মদ আলী।

পাড় থেকে ট্রলারে করে দু থেকে তিন মিনিটেই পৌছে যাওয়া যায় লঞ্চডুবির স্থানটিতে, যেখানে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় লঞ্চটি টেনে তোলার চেষ্টা করছে।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে বেশ কয়েক দফা চেষ্টা করেও ডুবে যাওয়া লঞ্চটি তোলা যায়নি। শেষপর্যন্ত বিকেলে লঞ্চটি টেনে তুলতে পারলেও তীরে ভেড়াতে গিয়েও নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে।

উদ্ধারকারী লঞ্চের সাথেই অপর একটি লঞ্চে ছিলেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ-র চেয়ারম্যান ড. শামসুদ্দোহা খন্দকার।

তিনি বলছিলেন, আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়েই লঞ্চটি ডুবে গিয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন।

তবে ডুবে যাওয়ার আগে লঞ্চটি থেকে কোন ধরণের সংকেত দেয়া হয়নি এবং মোবাইল ফোন ছাড়া কর্তৃপক্ষ কিংবা কোস্টগার্ডের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগের কোন ব্যবস্থাও লঞ্চগুলোতে নেই।

“এখন মোবাইলেই সমস্ত যোগাযোগ হয়। কিন্তু তারা আমাদের তারা কোন সংকেত পাঠায়নি। কিন্তু জাহাজটি ডুবেছে তিনটায় এবং আমরা সোয়া তিনটায় জানতে পারি। সাড়ে তিনটার মধ্যেই উদ্ধারকারী জাহাজ এখানে পৌছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।”

লঞ্চটিতে যাত্রীদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট কিংবা লাইফবোট ছিল কিনা, সেটিও জাহাজটি তোলার পরই বোঝা যাবে বলে জানান মি. খন্দকার।

যদিও বিআইডব্লিউটিএ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লঞ্চ দূর্ঘটনার সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। তবে গত দু’বছরে এরকম তিনটি লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে।

২০১২ সালে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার কাছেই মেঘনা নদীতে অপর একটি লঞ্চডুবিতে প্রায় দেড়’শ যাত্রী নিহত হয়।