লাটাই জড়ানো ৭০ ফুট কাগজে বিশ্বকাপের রেকর্ড

দীননাথ পালের ঘর জুড়ে বিশ্বকাপের ইতিহাস
ছবির ক্যাপশান, দীননাথ পালের ঘর জুড়ে বিশ্বকাপের ইতিহাস
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
  • Published

বেসরকারি নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ করা কলকাতার এক যুবক সেই ১৯৩০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস নিজের উদ্যোগে যোগাড় করেছেন।

একের পর এক সাদা কাগজ জুড়ে তৈরি ছবি আর তথ্যে ঠাসা ওই ইতিহাসের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ ফুট।

দৈনিক মজুরীতে কাজ করা ওই যুবকের মাসিক আয়ের অনেকটাই চলে গেছে এই ইতিহাস সংগ্রহ করে সেগুলিকে সাজিয়ে তুলতে।

কলকাতার পাতাল রেল যেখানে শেষ হয়েছে দক্ষিণ দিকে, সেই গড়িয়া থেকে অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে একটা ছোট্ট ঘরে মায়ের সঙ্গে থাকেন দীননাথ পাল। ঘরের ভেতরে খাট, টেবিল, তাক – সব জায়গাতেই পুরনো কাগজ, পত্রপত্রিকা ছড়ানো।

লাটাইতে জড়ানো বিশ্বকাপের ইতিহাস

লাটাইতে জড়ানো বিশ্বকাপের ইতিহাস
ছবির ক্যাপশান, লাটাইতে জড়ানো বিশ্বকাপের ইতিহাস

তার মধ্যে থেকেই দীননাথ বার করলেন একটা বিশাল আকারের ঘুড়ি ওড়ানোর লাটাই। তাতে কাগজ জড়ানো রয়েছে। লাটাইটা ঘোরাতে ঘোরাতে মি. পাল বর্ণনা করছিলেন বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস – অনেকটা যেমন করে ছবি দেখিয়ে পট-চিত্রশিল্পীরা বর্ণনা দেন।

লাটাই যত ঘুরছে, ততই চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ইতিহাসের পাতা।

দেখাচ্ছিলেন আর কথা বলছিলেন দীননাথ পাল, “প্রতিটা ম্যাচের স্কোর, কারা গোল করেছেন এসব যেমন আছে, তেমনই রয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেওয়া বিখ্যাত ব্যক্তিদের বর্তমান অবস্থা। রয়েছে পেলে, মারাদোনা, ইউসোবিও বা গ্যারিঞ্চাদের জীবনী – আর প্রচুর ছবি।”

মি. পাল জানালেন তিনি নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ করেন। দিনে ১৪০ টাকা বেতন – মাস গেলে চার হাজার দুশো টাকা।

"কিন্তু আমার মা শিখিয়েছিলেন plain living, high thinking এর তত্ত্ব – তাই মাটিতে শুয়েও চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি।"

মায়ের কাছ থেকে পাওয়া নেশা

বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে , তাই এখন রোজ আঠেরোটা করে খবরের কাগজ কিনছেন তিনি। ফলে বেতনের অর্ধেকটা চলে যাবে। "মা আর বোনের কাছে হাত পাততে হয়।“

মা দীপিকা পাল বলছিলেন তিনি নিজেও ছোট থেকেই সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ খবর আর ছবি জমাতেন। ছেলেরও ছোট থেকেই সেই একই নেশা – ইতিহাস খোঁজা আর সাজিয়ে রাখা।

hisory
ছবির ক্যাপশান, খবরের কাগজ থেকে কেটে নানা ইতিহাস যত্নে রেখেছেন দীননাথ পাল

“ব্রিটিশ আমলে দেশলাই বাক্স, টুথপেস্টের বাক্সতে খুব সুন্দর সুন্দর ছবি থাকত। আমার বাবার হবি ছিল ওই সব ছবি সংগ্রহ করে একটা খাতায় লাগিয়ে রাখার। বিয়ের পরে তিনি আমাকে ওই খাতাটা দিয়েছিলেন। আমি শুরু করলাম খবরের কাগজের ছবি আর তথ্য যোগাড় করতে। আর আমার দেখে ছেলে খুব ছোট বয়স থেকেই এই নেশাটা পেয়েছে। আমি ওকে শেখাই নি, নিজেই শিখেছে,” বলছিলেন মিসেস পাল।

শুধু বিশ্বকাপের ইতিহাস নয়, দীননাথ পালের ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও অনেক ধরণের ইতিহাস। কখনোও আস্তাকুঁড় থেকে ভিখারিনীদের সঙ্গে ঝগড়া করে ছিনিয়ে নেওয়া কাগজের টুকরো, কখনও বা নগদ অর্থ দিয়ে কোনও সংগ্রাহকের কাছ থেকে কেনা সেই সব ইতিহাসের পাতা।

তাঁর কথায়, “সচিন তেন্ডুলকার, কপিল দেবদের জীবনী তৈরি করেছি। বহু পুরনো ঘটনার খবর রয়েছে এমন সংবাদপত্র যোগাড় করেছি। যেমন ১৯৪০ সালের টাইমস অফ ইন্ডিয়াতে বেরনো বিশ্বযুদ্ধের খবর বা ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার খবর – এসব আছে। জহরলাল নেহরু মারা যাওয়ার খবর বেরিয়েছিল যেদিন, সেদিনের যুগান্তর কাগজের একটা পাতা কিনতে হয়েছে একজনের কাছ থেকে তিন হাজার টাকায়।“

ছেলে হাত দিয়েছেন বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাস যোগাড় করে একটা বই তৈরির কাজে। আর মা সেটার জন্য কয়েকজন প্রকাশকের কাছে গিয়ে প্রচুর টাকা দিতে হবে শুনে মন খারাপ করে ফিরে এসেছেন – কিন্তু তাতে তাঁদের উৎসাহে ভাঁটা তো পড়েই নি বরং আর কোথা থেকে কী তথ্য সংগ্রহ করা যায়, তার খোঁজই করে চলেছেন দুজনে।