লোক দিয়ে ধর্ষণ করিয়ে দেবো: তাপস পাল

টেলিভিশনে ভিডিওটি প্রচারিত হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে
ছবির ক্যাপশান, টেলিভিশনে ভিডিওটি প্রচারিত হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে
    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
  • Published

ভারতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিবারের মহিলাদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বিপাকে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি ও অভিনেতা তাপস পাল।

ভারতের জাতীয় মহিলা কমিশন তার সংসদ সদস্যপদ বাতিলের দাবি তুলেছে।

কিছুদিন আগে নদীয়ার একটি সভায় তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে এই হুমকি দিয়েছিলেন।

সোমবার সংবাদ মাধ্যমে তার বক্তব্যের এই ভিডিও প্রচার হওয়ার পরে তার বিরুদ্ধে সারা ভারতজুড়েই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

মহিলা আন্দোলনের কর্মীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

চাপের মুখে তাপস পাল তার বিতর্কিত ভাষণের কারণে আজ দলের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ।

বিরোধী দলীয় মহিলা সদস্যদের ধর্ষণ করানোর প্রকাশ্য হুমকি দেওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য তাপস পালকে পার্লামেন্টরই শাস্তি দেওয়া উচিত বলে মনে করছে ভারতের জাতীয় মহিলা কমিশন।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ও অভিনেতা তাপস পাল ধর্ষণ আর খুনের হুমকি দেওয়ার পরে আজ দলের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

কিন্তু মহিলা আন্দোলনের কর্মী বা বিরোধী দলগুলো বলছে শুধু ক্ষমা প্রার্থনা এই অপরাধের শাস্তি হতে পারে না। ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী তাঁকে গ্রেপ্তার করা উচিত।

বাংলা ছায়াছবির এক সময়ের নায়ক ও দু’বার জয়ী এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মহিলা সংগঠনগুলো রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ক্ষোভ ছড়িয়েছে গোটা ভারতেই।

পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন সুনন্দা মুখার্জী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তিনিও আশা করেন যে “সংসদের উচিত নিজের থেকেই মি . পালের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।”

মহিলা কমিশনের সুরেই মি. তাপস পালের সংসদ সদস্য পদ খারিজ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু।

প্রায় এক মাস আগে নদীয়া জেলার নাকাশীপাড়া এলাকায় এক ভাষণ দিতে গিয়ে মি. পাল বিরোধী দলীয় কর্মীদের হুমকি দিয়েছিলেন।

দলের কাছে চিঠি লিখে ক্ষমা চেয়েছেন তাপস পাল
ছবির ক্যাপশান, দলের কাছে চিঠি লিখে ক্ষমা চেয়েছেন তাপস পাল

গতকাল এই ভিডিও দুটি স্থানীয় টিভি চ্যানেলের হাতে আসে।

কী বলেছিলেন মি. পাল ?

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে তিনি বলছেন, “যদি বিরোধী কেউ থেকে থাকেন, শুনে রাখুন, যদি এই গ্রামে আমাদের মা বোন, বাচ্চা, চাচা, চাচি – কারও গায়ে হাত পরে, এই তাপস পাল ছেড়ে কথা বলবে না আমি বলে রাখলাম।”

“তাপস পাল নিজে রিভলবার বার করে গুলি করে দিয়ে চলে যাবে। একজনের গায়ে হাত পড়লে তাদের বাড়ি এখান থেকে ভেঙ্গে চৌপাট করে দেবে তাপস পাল।”

রীতিমতো ফিল্মি ডায়লগের কায়দায় দেওয়া ওই ভাষণে তিনি আরও বলেন, “আমি প্রচুর মস্তানি করেছি। আমি চন্দননগরের মাল, কলকাতার মাল না। আমি পকেটে মাল নিয়ে ঘুরি।”

তার পরেই তাঁর ভাষণের সবথেকে বিতর্কিত মন্তব্য, “যদি তৃণমূলের কারও গায়ে হাত দেয়, তাদের গুষ্টিকে আমি .. যা-তা করে দিয়ে চলে যাব। আমার ছেলেদের ঢুকিয়ে দেব, রেপ করে চলে যাবে। রেপ করে চলে যাবে।” বলেন তিনি।

এই কথা শুনে উপস্থিত দর্শকদের তুমুল হাততালি দিতেও শোনা যাচ্ছে ওই ভিডিওটিতে।

এই ভিডিও প্রচারিত হওয়ার পরে মি. পাল মাত্র একবারই সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছিলেন যে তিনি ধর্ষণ বা রেপের কথা বলেন নি, তিনি বলেছিলেন দলের ছেলেদের দিয়ে রেইড বা হানা দেওয়াবেন। তার মাথা গরম ছিল দলীয় কর্মীরা মার খাওয়ায় – তাই ওইসব বলেছিলেন।

চলচ্চিত্র জগতের ব্যক্তিত্বরা বলছেন, যে অভিনেতা তাপস পালকে তাঁরা চিনতেন, তাঁর মুখ থেকে এই কথা শুনে তাঁরা সবাই আহত হয়েছেন।

ভিডিওটি প্রচারিত হওয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেস দল জানিয়ে দেয় যে তারা তাপস পালের ওই বক্তব্য কোনোভাবেই সমর্থন করে না আর এবিষয়ে মি. পালের কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে।

তবে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জী এখনও পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করেন নি।

আজ মমতা ব্যানার্জী এক জনসভায় ওই প্রসঙ্গ উল্লেখ না করেই শুধু বলেন যে তিনি অশ্লীল কথা পছন্দ করেন না।

বিকেলে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে তাপস পাল নি:শর্ত ক্ষমা চেয়েছেন এক চিঠির মাধ্যমে।

মহিলা আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন শুধু দলের কাছে নি:শর্ত ক্ষমা চাওয়াটা তাঁর অপরাধের শাস্তি হতে পারে না। চিত্র পরিচালক ও মহিলা আন্দোলনের কর্মী অনিন্দিতা সর্বাধিকারী বলছিলেন, “তিনি প্রকাশ্যে যে কথা বললেন, তার পরে শুধু লিপ সার্ভিসের মতো দলের কাছে একটা চিঠি দিয়ে ক্ষমা চাইলেই হয়ে যায় না কি!”

মহিলা আন্দোলনের আরেক নেত্রী শ্বাশ্বতী ঘোষের কথায়, “এই মন্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যায় যে তিনি ধর্ষণটাকে একটা অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছেন। সেটাই বড় বিপদ।”

এটাই যে চূড়ান্ত শাস্তি নয়, তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা সেরকম ইঙ্গিত দিলেও আদৌ কতটা শাস্তি দেওয়া হবে, তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।

মি. তাপস পাল এর আগেও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন বা হুমকি দিয়েছেন।

ধর্ষণ বা খুনের হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও এখনও পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয় নি কেন – এই প্রশ্ন উঠছে।

প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা না নিলেও বি জে পি আজ নদীয়ার যে নাকাশীপাড়া এলাকায় তাপস পাল ওই হুমকি ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানকার থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

আর কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলাও দায়ের করা হয়েছে।