কলকাতায় মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের নৃশংসতা

ছবির উৎস, no credit
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
- Published
ভারতের কলকাতায় একটি প্রথম সারির সরকারি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থী ডাক্তাররা এক ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে মেরেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ছাত্রাবাসে মোবাইল ফোন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল ওই ব্যক্তি – তারপর তাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বাঁশ ও রড দিয়ে বীভৎসভাবে পেটায় ছাত্ররা, এমন কী কেটে নেওয়া হয় তার যৌনাঙ্গও।
ওই মেডিক্যাল কলেজের কর্তৃপক্ষ গোটা ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে, পুলিশও আলাদাভাবে এই মৃত্যুর তদন্ত করছে।
কলকাতার সবচেয়ে নামী একটি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের এই নৃশংস আচরণ হতবাক করেছে সবাইকে।
কীভাবে ঘটল এই ঘটনা?
এই ঘটনাটি রোববার সকালের, কলকাতার নীলরতন সরকার বা এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাসের। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জেনেছে, ভোরবেলায় ছাত্রাবাসের একটি ঘর থেকে মোবাইল ফোন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় বছর তিরিশের এক যুবক। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বেঁধে গণপিটুনি শুরু করে দেয় হবু ডাক্তাররা, আর সঙ্গে চলে নৃশংস অত্যাচার।
ছাত্রাবাসের পাশের একটি ভবনে কাজ করছিলেন জনাকয়েক নির্মাণকর্মী, তাদেরই একজন রবিউল পরে সংবাদমাধ্যমকে জানান তিনি ছাত্রদের ওই ব্যক্তিকে পেটাতে দেখেছেন। বাঁশ ও লাঠি দিয়েই যে ডাক্তারির ছাত্ররা তাকে মারছিল, সে কথাও তিনি নিশ্চিত করেন।
পুলিশ যখন খবর পেয়ে মৃতপ্রায় ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে নিয়ে যায়, ততক্ষণে তিনি মারা গেছেন। পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ায় শরীর থেকে রক্তক্ষরণও হয়েছে প্রচুর।
এই নৃশংস ঘটনার খবর প্রচারিত হওয়ার পর তা অনেককেই অবাক করেছে। কলকাতার একটি নামী মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের এই নৃশংসতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সাবেক প্রধান ড: অশোক চৌধুরীর কথায়, ‘এরাও ডাক্তার, এবং এরাও মানুষ – মানুষের সব স্বাভাবিক দোষগুণও তাদের থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে কাউকে পুলিশের হাতে তুলে না-দিয়ে নিজেরাই পিটিয়ে মেরে ফেলবে – এটা কী ধরনের কথা? পুলিশের উচিত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া!’
কলকাতার এন্টালি থানার পুলিশ নিজে থেকেই খুনের মামলা রুজু করে এই ঘটনার তদন্তে নেমেছে, জেরা করা হয়েছে ছাত্রাবাসের দুজন কর্মীকেও।
তবে ওই কলেজের ছাত্রাবাসে বহু বছর কাটানো এবং রাজ্যে এখন বহু মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কর্ণধার ড: নন্দন গুপ্ত বিবিসিকে বলছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনাই।
তাঁর যুক্তি, ‘এটা এনআরএস কলেজের বা পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি নয় মোটেই। আমাদের সময় ছাত্ররা মেডিক্যালের পড়ার চাপেই ডুবে থাকত, ছাত্রাবাসে নেশা করারও কোনও চল ছিল না। আমার ধারণা কিছু ছেলে উত্তেজনার বশেই এমন সাঙ্ঘাতিক কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে।’
ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা
এই ধরনের গণপিটুনিতে একটা ‘মব সাইকোসিস’ কাজ করে – ফলে আলাদাভাবে কারও মধ্যে হয়তো খুন করার কোনও ইচ্ছে না-থাকলেও প্রত্যেকের অল্প অল্প যোগদানে সেই পিটুনি ক্রমে মারাত্মক আকার নেয় – বলছিলেন ড: গুপ্ত।
বর্বর গণপিটুনির পেছনে যে মনস্তত্ত্বই কাজ করে থাকুক, ইদানীং ডাক্তারির ছাত্রদের মধ্যেও যে অসহিষ্ণুতা ক্রমশ বাড়ছে, তা নিয়ে অবশ্য কোনও সন্দেহ নেই প্রবীণ চিকিৎসক অশোক চৌধুরীর।
তাঁর কথায়, ‘সাতচল্লিশে ছাত্র হিসেবে মেডিক্যাল কলেজে ঢুকেছি, কর্মজীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে এনআরএস আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন দেখছি ছাত্রদের মধ্যে অস্থিরতা আর অসহিষ্ণুতা ক্রমে এতই বাড়ছে যে তারা কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করছে না!’








