মেসি-রোনাল্ডো: তারকা থেকে কিংবদন্তী হবার লড়াই

world cup messi ronaldo
ছবির ক্যাপশান, বিশ্বকাপ : মেসি রোনাল্ডোর অপূর্ণ স্বপ্ন
    • Author, পুলক গুপ্ত
    • Role, বিবিসি বাংলা, ল্ন্ডন
  • Published

ফুটবলে এমন কিছুই নেই - যা লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর পাওয়া হয় নি। শিরোপা, খ্যাতি, অর্থ, পুরস্কার, বিশ্বজোড়া কোটি কোটি ভক্ত - সবই পাওয়া হয়ে গেছে তাদের।

শুধু একটি জিনিস ছাড়া।

সেটি হলো ফুটবলের বিশ্বকাপ - যা আজও আর্জেন্টিনা আর পর্তুগালের এই দুই তারকার পাওয়া হয় নি। প্রতি চার বছরে একবার করে বিশ্বকাপ আসে, আর আমাদের সবাইকে মনে করিয়ে দেয় - পৃথিবীর সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের অন্যতম বলে স্বীকৃত হলেও মেসি আর রোনাল্ডোর কাছে বিশ্ব ফুটবলের এই একটি শিখর আজও অধরা হয়ে গেছে।

রোনাল্ডো আর মেসি
ছবির ক্যাপশান, রোনাল্ডো আর মেসি

এই দুজনই খেলেন বিশ্বের সেরা দুই ক্লাবে। তাদের নৈপুণ্য অতুলনীয়, চোখ ধাঁধানো। তারা দুজন মিলে ৬ বার 'ফিফার বিশ্বসেরা ফুটবলার' বা 'সোনার বল' জিতেছেন, মোট ৫ বার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন। শত শত গোল করেছেন, লিগ জিতেছেন। তারা যখন মাঠে নামেন, তখন পৃথিবীর সব মহাদেশের কোটি কোটি দর্শক টিভির পর্দার সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। বিভিন্ন পণ্যের জন্য তারা মিলিয়ন ডলারের মডেল।

তারা আন্তর্জাতিক তারকা, কোন সন্দেহই নেই। কিন্তু তারা কি কিংবদন্তী? তারা কি সেই অমরত্ব পাবেন - যা বিশ্বকাপজয়ী পেলে, মারাডোনা, জিদান বা বেকেনবাওয়াররা পেয়েছেন? যে কোন ফুটবল বিশেষজ্ঞই বলবেন - নৈপুণ্য, শিরোপা, গোলের সংখ্যা বা ব্যক্তিগত পুরস্কারের বিচারে লিওনেল মেসি বা ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো ওই সব কিংবদন্তীদের কারো চাইতেই কম নন, অনেক ক্ষেত্রে তাদের চাইতে বরং শ্রেষ্ঠতর। কিন্তু এদের মধ্যে পার্থক্য ওই একটিই - বিশ্বকাপ।

messi
ছবির ক্যাপশান, লিওনেল মেসি

বিশ্বকাপে ছবিটা একেবারেই আলাদা। লিওনেল মেসি বিশ্বকাপে খেলেছেন মোট ৫৭১ মিনিট - গোল করেছেন মাত্র ১টি। রোনাল্ডো বিশ্বকাপে খেলেছেন মোট ৭৫৪ মিনিট - গোল করেছেন মাত্র দুটি। এর বিপরীতে দেখুন, পেলে তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছেন, গোল করেছেন মোট ১২টি। ব্রাজিলিয়ান ন্যাড়ামাথা রোনাল্ডোকে নিশ্চয়ই ভুলে যান নি, বিশ্বকাপে তার ১৫টি গোল, শিরোপা জয় একবার। মারাডোনার বিশ্বকাপ গোল ৮টি, শিরোপা জয় একবার।

১৯৬৬র পর ইংল্যান্ড আর বিশ্বকাপ জেতেনি। তবে ইংলিশ স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার ১৯৮৬-র বিশ্বকাপে ৬টি গোল করে 'গোল্ডেন বুট' পেয়েছিলেন। তিনি বলছেন, "ফুটবলে আপনাকে যদি সত্যিকার মহৎ খেলোয়াড়দের তালিকায় নাম ওঠাতে হয়, তাহলে আপনাকে বিশ্বকাপে কিচু করে দেখাতে হবে। যদি আপনার দেশকে বিশ্বকাপ জেতাতে না-ও পারেন, অন্তত এই প্রতিযোগিতায় একটা বড় কিছু অর্জন করতেই হবে।"

"পেলে বা মারাডোনার বিপরীতে, মেসির এই একটি ক্ষেত্রেই কমতি রয়ে গেছে যে তিনি বিশ্বকাপ জেতেন নি। হয়তো এবার মেসি পারবেন", বলছিলেন লিনেকার।

ronaldo
ছবির ক্যাপশান, রোনাল্ডো

তবে ফুটবলে অমরত্বের পথে বিশ্বকাপ বিজয় এটি একটি নির্মম মাপকাঠি - সেনার হরিণই বলতে পারেন। কারণ এটা হয় চার বছরে একবার। অনেক বড় বড় খেলোয়াড় বিশ্বকাপে খেলতেই পারেন নি, তাদের দেশ চূড়ান্ত পর্বে উঠতে পারে নি বলে। যেমন জর্জ বেস্ট বা আলফ্রেডো ডি স্টেফানো, এ বছর - সুইডেনের ইয়ালাতান ইব্রাহিমোভিচ।

কেউ আবার মাঝের তিন বছর ভালো খেলেছেন, কিন্তু ঠিক বিশ্বকাপের সময় চোট বা অন্য কারণে দলে জায়গা পান নি।

অনেক বিশ্লেষক আবার বলেন, বিশ্বকাপ জেতা-না-জেতা দিয়ে এখনকার ফুটবলারদের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা ঠিক নয়। তারা বলেন এ যুগে বিচারের মাপকাঠি হওয়া উচিত ইউরোপের চ্যাম্পিয়নস লিগ।

maradona
ছবির ক্যাপশান, মারাডোনা

বিবিসির টম ফরডাইস বলছেন, একে দেখতে হবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। "স্যাটেলাইট টিভির কল্যাণে আমরা মেসি আর রোনাল্ডোদের খেলার প্রায় প্রতি সপ্তাহে দেখছি। কিন্তু পেলের খেলা তো আমরা প্রতি সপ্তাহে দেখতে পেতাম না। তাই পেলে সম্পর্কে আমাদের ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে তার সেরা খেলাগুলোর গল্প মিলিয়ে - প্রতিটি ম্যাচে তিনি কেমন খেলেছিলেন তা দিয়ে নয়। কিন্তু মেসি আর রোনাল্ডোকে আমরা দেখছি একটি ম্যাচে ভালো করছেন, আবার পরের ম্যাচেই হয়তো তেমন কিছুই করতে পারলেন না। তাই এ দুজনের সম্পর্কে আমাদের মনে ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছে ভিন্নভাবে।"

টম ফরডাইস বলছেন, "পেলেকে যেসব রক্ষণভাগ মোকাবিলা করতে হয়েছিল - তা কি মেসি আর রোনাল্ডোর প্রতিপক্ষের মতো সংগঠিত বা পরিকল্পিত ছিল? অথবা, যেসব ডিফেন্ডারদের হাতে মারাডোনাকে প্রায়ই ক্ষতবিক্ষত হতে হতো - সেরকম প্রতিরোধের সামনে পড়লে মেসি বা রোনাল্ডো কি তাদের যাদু দেখাতে পারতেন?"

pele
ছবির ক্যাপশান, বিশ্বকাপ জয়ে আবেগাপ্লূত পেলে

কিন্তু এর উল্টো যুক্তি বলে, বৈশ্বিক আবেদনের বিচারে চ্যাম্পিয়নস লিগ এখনো বিশ্বকাপের চেয়ে বহু পিছিয়ে। যেমন, ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল টিভিতে দেখেছে ১৫ কোটি দর্শক। আর ২০১০এর বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছে তার ছয় গুণ লোক - ৯০ কোটি!

আর্জেন্টিনার ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলার অসভাল্ডো আর্ডিলেস বলেছেন, "একটি বার বিশ্বকাপ জয়ের বিনিময়ে মেসি তার বাকি সব মেডাল ত্যাগ করতে রাজি আছে।"

রোনাল্ডোর জন্যও ২০১৮-র বিশ্বকাপের চিন্তা অর্থহীন। যা করার তা করতে হবে এবারই।

কারণ, বিশ্বকাপ জয় হলো ফুটবলের শীর্ষবিন্দু।

মেসি আর রোনাল্ডোর জন্যেও - যদি এদের কোনো একজন এবার সেই শিখর স্পর্শ করতে পারেন - এ বিজয় তাদের ফুটবল কেরিয়ারকে দেবে পূর্ণতা, মাথায় পরিয়ে দেবে বিশ্বসেরার রাজমুকুট।

দুজনের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠতর - সেই বিতর্কেরও হয়তো চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে যাবে তখনই।